পাহাড়ের বুকে মনকাড়া মুনলাই পাড়া, বান্দরবান।

মুনলাই পাড়া

সাঙ্গু নদী বয়ে গেছে বান্দরবান জেলার উপজেলা রামু দিয়ে। প্রায় ৪৯২ বর্গ কিলোমিটারের এই উপজেলার রুমা বাজার থেকে আরও ৩ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌছতে হয় মুনলাই পাড়ায়। নামটা যেমন একটু ভিন্ন জায়গাটাও ঠিক তেমনই সুন্দর এবং ভিন্ন ধাঁচের। সচরাচর আমরা যেসব জায়গায় ঘুরতে যাই সেসব জায়গা থেকে একটু আলাদা।

আর যেহেতু সেখানে একটি সম্প্রদায় থাকে, তাদের ঘর-বাড়ি, জীবনযাত্রা সবকিছু ঘুরে দেখতেই পর্যটকরা মূলত যান। তাই অনায়াসে একে কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজমও বলতে পারেন। আজকের লেখায় বিশদভাবে আলোচনা হবে যে কেন এই পাড়াটি ভিন্ন আর কীভাবে যেয়ে কি কি ঘুরে দেখতে পারেন সেখানে। চলুন তাহলে জেনে নেয়া যাক।

কেওক্রাডং এবং বগা লেক যাবার পথে-প্রান্তে এটি একটি বম পাড়া। বম একটি পাহাড়ি সম্প্রদায়। সেই পাড়ায় গিয়ে আপনার দেখা মিলবে ৫৪টি পরিবারের সাথে। সেখানেই এই পরিবারগুলোর স্থায়ী বসবাস। বান্দরবান জেলার পাহাড়-পর্বতে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীগুলোর যেসব পাড়া বা বসতি দেখা যায়, সেগুলো থেকে এই মুনলাই পাড়া একেবারেই অন্য রকম।

যেতে যেতে পাহাড়ি রাস্তা। আর সেই রাস্তার দু-পাশে বিভিন্ন রকমের রঙ-বেরঙের ফুল গাছ, ছোট আকারের ঝকঝকে বাড়ি। বাড়িগুলো আর দশটি পাহাড়ি বাড়ির মতো মাচার উপরই তৈরি করা। সেখানকার কিছু কিছু ঘরে আবার রঙিন টিন দিয়ে ছাউনি দেয়া। আর বাড়িগুলোর মেঝে কাঠ দিয়ে বানানো।

একটি বিষয় মাথায় রাখতে হবে যে, যেহেতু জায়গাটি একটি সম্প্রদায়ের পাড়া, সেহেতু সেখানে গেলে বম সম্প্রদায়ের বাসায় বাসায় গিয়ে থাকতে হবে। তবে এ নিয়ে চিন্তার কিছু নেই। কারণ, সেখানে গিয়ে বমদের বাসায় উঠেই টের পেয়ে যাবেন তাঁরা কতটা অতিথি পরায়ণ।

এছাড়াও তাদের জীবনযাত্রা অভিজ্ঞতা করে উপভোগ করতে পারবেন খুব কাছ থেকেই। কাঠের মেঝেতেই তাঁরা বিছানা পেতে শুয়ে পড়ে। তাই আপনাকেও সেখানে গিয়ে এভাবেই থাকতে হবে। যে বাড়িতে থাকবেন, সেখানকার মালিককে দিনের হিসাব করে তাকে টাকা দিবেন। বাড়িতে ওঠার আগে তাই ভালো করে জেনে নিবেন দরদাম। যেন পরবর্তীতে হিসাব নিয়ে কোনও ঝামেলা না হয়।

মুনলাই পাড়া

মুনলাই এর এই কমিউনিটি বেজড ট্যুরিজম প্রায় ২-৩ বছর আগেই শুরু হয়েছে। তাই সেখানে খুব বেশি সংখ্যক বাড়িতে এখনও থাকার ব্যবস্থা হয়নি। হাতেগোনা কয়েকটা বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা পুরোপুরি আছে। বাড়িতে না থেকেও কেউ যদি তাঁবু টাঙিয়ে থাকতে চান সেটাও পারবেন। তবে অভিজ্ঞতা থাকলেই তাঁবুতে থাকার সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত।

সেখানে গিয়ে ট্র্যাকিং করতে পারেন, নদী বা খালে কায়াকিং, ৫৫০ ফুট দৈর্ঘ্য এর জিপলাইন এর অভিজ্ঞতা নিতে পারেন, এক গাছ থেকে আরেকটিতে চড়ে বিশেষ রকমের খেলা (ট্রি-টপ অ্যাকটিভিটি) করতে পারেন। পাহাড়ি এলাকার স্বচ্ছ আকাশ, দিগন্ত বিস্তৃত পাহাড়, অপরূপ সবুজের খেলা আর সাদা মেঘের ভেলায় আপনার মন মিশে যাবে একদম! সেখানে গিয়ে আপনি সাধারণ রান্নার পাশাপাশি পাহাড়ি বা বমদের স্পেশাল আইটেম খেতে চাইলেও তাদের বললেই হবে। তাঁরা সেসব আইটেম রান্না করে আপনাকে খাওয়াবে।

মাথার ওপর রাতের অগণিত তারা, রাতে গাঢ় সবুজ বন, রাত করে জেগে থাকা পাখি, বিভিন্ন পোকামাকড়ের আওয়াজ, তক্ষকের ডাক! মুলাই পাড়ার রাতটা আপনার এভাবেই কাটবে! এছাড়াও অনেকে আবার ক্যাম্পফায়ার বা বারবিকিউ এর আয়োজনও করে থাকেন। সাথে নিজেই ধরতে পারেন পছন্দের কোনও গান অথবা বমদের সাংস্কৃতিক গানও শুনতে পারেন। পরিবেশটাই অন্য রকম হয়ে উঠবে।

এছাড়া বগা লেক আর কেওক্রাডং-এর পথ ধরে আরও উঁচুতে গিয়ে উপভোগ করতে পারেন সূর্যোদয়। পাহাড় থেকে সেই সোনালি আভায় সূর্য ওঠার দৃশ্য একেবারে দেখার মতন! তাই মুনলাই পাড়া যে আপনার মন কাড়বে, তা বলাই বাহুল্য!

যাওয়ার উপায়

প্রথমে ঢাকা থেকে বান্দরবান। এরপর বান্দরবান থেকে রুমা বাজার পর্যন্ত যেতে হবে বাসে। এছাড়াও চান্দের গাড়িতেও যাওয়া যাবে। রুমা বাজারের আগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গ্যারিসনে আগে নাম লেখাতে হবে। এরপর আবার রুমা বাজারের আর্মি ক্যাম্পে নাম লিখিয়ে অনুমতি নিতে হবে (তবে কমিউনিটি বেইজড ট্যুরিজমের মাধ্যমে যদি যান, তাহলে তাঁরা আগে থেকেই অনুমতি প্রক্রিয়া শুরু করে দেন)।

অবশ্যই সাথে করে জন্ম নিবন্ধন সনদ, জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে যাবেন। রুমা বাজার থেকে কেওক্রাডং ও বগা লেক সড়কে ৩ কিলোমিটার পরই পৌঁছে যাবেন মুনলাই পাড়ায়।

কপিরাইট:- travelbd.xyz

Leave a Reply