বিবস্ত্র বাংলাদেশ ! ধর্ষণ বন্ধের উপায় কি ?

ইন্টারনেটের কল্যাণে আমরা সমাজে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার খবরাখবর সম্পর্কে খুব সহজে তথ্য পাই ।বিবস্ত্র বাংলাদেশ ! ধর্ষণ বন্ধের উপায় কি ?

সম্প্রতি নোয়াখালীর বেগমগন্জে গৃহবূধু কে বিবস্ত্র করে শারিরীক নির্যাতনের ঘটনা ও সিলেট এমসি কলেজ হোসেটাসে গৃহবূধুকে স্বামীর সামানে চার জন মিলে গণ ধর্ষণের ঘটানা সহ আরো অন্য যে ঘটনা গুলো ঘটেছে তা সারা বাংলাদেশের ১৬ কোটি বাঙ্গালী সহ সারা বিশ্বের সকল বাঙ্গালীর হৃদয় হরণ করেছে ।

বাংলাদেশে ইদানিং ধর্ষণের মাত্রা বেড়ে গেছে আগের থেকে বহু গুনে । ফোন হাতে নিয়ে ফেসবুক, ইউটিউব, খবরের পেপার, টেলিভিশন যে খানেই ঢুকি না কেনো একটি কমন নিউজ আর সেটি হলো ধর্ষন।

সমাজের নিম্নস্তর থেকে শুরু করে সব জায়গায় ধর্ষণ একটি প্রধান সমস্যা হয়ে আর্বিভূত হয়েছে।

পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে নানা অসঙ্গতির সঙ্গে ধর্ষণও ওতপ্রোতভাবেভাবে জড়িত। এটি একমাত্র নির্মূল অবস্থায় দেখাযায় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে। এখন সেসবও অতীতের গল্প।

বিবস্ত্র বাংলাদেশ

গত ১০ দিনের ঘটে যাওয়া উল্যেখযোগ্য কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা :-

নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে যে ঘটনা টি ঘটেছে এটিকে ধর্ষণ বললেও কম বলা হবে। এ ধরণের নারকীয় অত্যাচার মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও হার মানিয়েছে। ঐ নারীর করুণ আর্তনাদ শুনে আসমান কেঁপে যাচ্ছে, কিন্তু রাষ্ট্রের পাষাণ মন অবিচল।

নোয়াখালীর বেগমগন্জের পৈশাচিক ধর্ষণ নারীর দেহের ওপর নারকীয়তার ভয়াবহ তান্ডবের অবতারণা দেখে দেশ মুষড়ে পড়েছে। বিবস্ত্র নারীর দেহই যেন আজ বাংলাদেশের মানচিত্র। চিৎকার করে কাঁদছে স্বাধীনতা। ঘটনা গুলি বলছে নিরবে বিবস্ত্র বাংলাদেশ।

বেগমগঞ্জের সেই নারী, সেই মা, সেই স্ত্রী নির্যাতকদের পায়ে–পায়ে ঘুরে যখন অসহায়ত্বের চিৎকার করছে পাড়া-প্রতিবেশীরা তখন দুয়ার আটকে চুপ! ফেসবুকে যখন ‘চ্যালেঞ্জিং টাইমসের’ সেল্ফিসহ কতরকম চ্যালেঞ্জের মচ্ছব, তখন হায়েনার দল নারীমাংস ছিঁড়ে খাচ্ছে আর উল্লাস করছে।

মরার পূর্বপর্যন্ত মানুষ বাঁচার চেষ্টা করে। বাঁচার চেষ্টায় ওই নারী কী–না করে গেলেন কিন্তু বাঁচাবার কোনো হাত পাওয়া গেল না।

আজ বেগমগঞ্জ, গতকাল সিলেট, তার আগে খাগড়াছড়ি, তার আগে খুলনা, তার আগে বগুড়াকোথায় না?

বেগমগঞ্জের যে ঘটনাটি ঘটেছে সেটি ৩২ দিন আগের ঘটনা তারা ভিডিও করে রেখেছিল এই উদ্দেশ্যে যে, ওই ভিডিও প্রকাশের হুমকি দিয়ে ওই নারীকে দাসী বানিয়ে রাখবে, ইচ্ছা মতো তাকে ধর্ষণ করবে নির্যাতনের মওকা মেলাবে। ভিডিও ভাইরাল হয়েছে বলে চার নির্যাতক গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ ।

সিলেটের এমসি কলেজে গত ২৫ সেপ্টেম্বরে স্বামীকে বেধে রেখে ০৬ মিলে এক নারীকে ধর্ষণ, খাগড়াছড়িতে প্রতিবন্ধি তরুণীকে দলবেধে গণধর্ষণ, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে তরুণীকে দুইদিন আটকে রেখে দলবেঁধে ধর্ষণ, নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জের কদমতলী এলাকায় অষ্টম শ্রেণির ছাত্রীকে ধর্ষণ, হবিগঞ্জে মাত্র পাঁচ হাজার টাকা চুক্তিতে ভয় দেখাতে গিয়ে মা-মেয়েকে ধর্ষণ!

এর বাইরেও কত নারী-যুবতির শ্লীলতাহানী হয়েছে তার হিসেব নাই।

বিবস্ত্র বাংলাদেশ

কাছাকাছি সময়ের আরও কিছু শিরোনাম।

  • মেয়েকে ধর্ষন করেছে বাবা
  • ৭০ বছরের বৃদ্ধাকে ধর্ষন
  • ফাদার ধর্ষন করেছে কিশোরীকে টানা ৩ দিন আটকে রেখে
  • বোনের সাবেক স্বামী তার বন্ধুদের নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীকে ধর্ষন- খুন/ আত্মহত্যা
  • স্বামীর সাথে নিরাপদ ভেবে বেড়াতে যাওয়া বধুকে ধর্ষন

সব কয়টি ঘটনা এতটা নির্মম আর বর্বর যা উল্লেখ করার মতো নয় ভাষা আমার জানা নেই।

সবচেয়ে পরিতাপের বিষয় হলো:- এ নির্মমতার সাহস পাচ্ছে কেবল বিচারহীনতার করনেই । ধর্ষক ধরা পড়ে ঠিকি কিন্তু বিচার হয় না । বিচারহীনতার দীর্ঘসূত্রতা এই দেশে ধর্ষণকে একটি রুটিনে পরিণত করে ফেলেছে।

আর একটি ভাবার বিষয় বেশিরভাগ ঘটনায় সামনে আসে হয়ত ছাত্রলীগ, নয়ত ক্ষমতাসীনদের কেউ না কেউ।

বাংলাদেশে এই যে ধর্ষণকামিতা শুরু হয়েছে এর বিচার ও অভিযুক্তদের শাস্তির রেওয়াজ খুবই নগন্য। ১% হবে না শাস্তি পাওয়া অপরাধির সংখ্যা।

বাংলাদেশে ধর্ষণ বিচারের পরিসংখ্যান :

চলতি বছরের (২০২০ সালে) জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ছয় মাসে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৬০১ জন নারী ও শিশু। এর মধ্যে একক ধর্ষণের শিকার ৪৬২ জন এবং দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৩৪ জন। ধর্ষণের শিকার হওয়াদের মধ্যে ৪০ জনের বয়স ৬ বছর এবং ১০৩ জনের বয়স ১২ বছরের মধ্যে। এ ছাড়া ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ নারীকে। আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছেন সাতজন নারী। ধর্ষণের চেষ্টা চালানো হয়েছে ১২৬ জন নারীর ওপর।

২০১৯ সালে বাংলাদেশ পুলিশের তথ্য অনুসারে ৫ হাজার ৪০০ নারী এবং ৮১৫টি শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়। ২০১৮ সালে শিশু ধর্ষণের মামলা ছিল ৭২৭টি এবং নারী ধর্ষণের মামলা ছিল ৩ হাজার ৯০০টি। পুলিশের হিসাব বলছে, গত বছর ধর্ষণের কারণে ১২ শিশু এবং ২৬ জন নারী মারা যান। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা ছিল ২১ নারী ও ১৪ শিশু।

তবে এ জরিপ খুবই নগন্য। মূলত ঘটনা এরচেয়েও কয়েক গুন বেশি। একটি জরিপেই দেখা গেছে— প্রতি হাজার ধর্ষণের মধ্যে মাত্র ৩৮৪টি পুলিশের কাছে নথিবদ্ধ হয়, ৫৭টিতে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে, ১১টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় যায়, ৭টি তে ১ বছরের বেশি শাস্তি দেওয়া হয় এবং ৬টিতে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাকি সবাই পার পেয়ে যায়। এছাড়াও সামাজিক লোকলজ্জার ভয়ে হাজার হাজার ধর্ষণের ঘটনা সামনেই আসে না।

বিচারহীনতার ভয়াবহ সংস্কৃতি :

বাংলাদেশে ধর্ষণের হার বাড়ার অন্যতম কারণ বিচারহীনতা সংস্কৃতি। বাংলাদেশে প্রতিবছর যে পরিমাণ ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটে, সে তুলনায় বিচারের হার একেবারেই কম।

বাংলাদেশে মেট্রোপলিটন এলাকায় নারী ও শিশু ধর্ষণের ট্রাইব্যুনালে যে বিচারগুলো হয় সেখানে মাত্র ২.৬ শতাংশ মামলায় চূড়ান্ত বিচারের রায় হয়। রায়ানের তথ্য মোতাবেক, প্রতি হাজার ধর্ষণের মধ্যে ৩৮৪টি পুলিশের কাছে নথিবদ্ধ হয়, ৫৭টিতে গ্রেপ্তারের ঘটনা ঘটে, ১১টি বিচারিক প্রক্রিয়ায় যায়, ৭টি তে ১ বছরের বেশি শাস্তি দেওয়া হয় এবং ৬টিতে কারাগারে পাঠানো হয়।

বাংলাদেশে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মামলা প্রক্রিয়ায় তদন্ত, ধর্ষণের মেডিকেল রিপোর্ট ও আইনজীবীর অনাগ্রহ বা পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে চূড়ান্ত রায়ে মামলা ডিসমিস হয়ে যায়। আইনগতভাবে তদন্ত কর্মকর্তাদের ৯০ দিনের মধ্যে তদন্ত শেষে চূড়ান্ত চার্জ দেওয়ার কথা থাকলেও পুলিশের কর্মভার ও পক্ষপাতদুষ্টতার কারণে অথবা প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকায় মামলার চার্জশিট সঠিক সময়ে দেওয়া হয় না। আবার মামলার চার্জশিটের ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত দুর্বলতার কারণেও ভুক্তভোগী নারী ও শিশু ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন।

বিবস্ত্র বাংলাদেশ

ধর্ষণ বন্ধের উপায় কি ? এই সমস্যার সমাধান কী আদৌ সম্ভব, কীভাবে সম্ভব?

০১. দরকার দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল :

কেবলমাত্র ধর্ষণের শাস্তি দিতে দ্রুত বিচার ট্রাইবুনাল গঠন এখন সবচে বড় দায়িত্ব। দেশে ধর্ষণের বিচারের জন্য স্পেশাল ফোর্স গঠন থেকে শুরু করে সকল ধরণের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা উচিত। ধর্ষকদের শাস্তি সর্বোচ্চ ৩০ দিনে সম্পন্ন হতে হবে। প্রমাণিত অপরাধে ফাঁসির রায় ও কার্যকর করার বিধান করে ফেলা উচিত এখন। ধর্ষণ প্রমানে শাস্তির সহজ পন্থা প্রনয়নও জরুরী একটি বিষয়।

দেশকে বাঁচাতে, জাতিগত ইজ্জত রক্ষার্থে এর বিকল্প নেই। সরকারের প্রতি নিবেদনধর্ষণকে একটিইমার্জেন্সি বিপদআখ্যা দিয়ে দেশের সর্বমতের লোকজনকে একত্রিত করে প্রতিটি স্থানে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ শুরু করুন।

এক লেখায় এর উত্তর দিয়েছিলেন লেখক ও নৃবিজ্ঞানী হেলাল মহিউদ্দীন। তিনি লিখেছেন: ০১. ধর্ষকদের গায়ের রাজনীতির পোশাকটি সরিয়ে ফেলুন বা পরতে দেবেন না। তাতেই ধর্ষণের সংখ্যা ৯০ ভাগ কমে যাবে।

০২. গ্রহণ করুন শরিয়া আইন :

ধর্ষণরোধে ইসলামী আইন গ্রহণ করুন। বিশ্বের বিভিন্ন সাম্রাজ্যবাদী শক্তিরা ধর্ষণ বা যে কোনো বিষয়ে ইসলামী আইনকে বাকা নজরে দেখে বা বিকৃতভাবে উপস্থাপন করে, কিন্তু ধর্ষণ বা এ ধরণের অপরাধে ইসলামের আইন সবচেয়ে কার্যকরী।

তাই বাংলাদেশে ধর্ষণরোধে ইসলামী আইন গ্রহণ করুন অথবা ইসলামী আইনের সাথে দেশের আইনকে সমন্বয় করুন। জনগণের সমর্থন-সহ সরকারের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পাবে। অন্তত ২/৪ টা ধর্ষণের শাস্তি হিসেবে ইসলামী আইন প্রয়োগ করে দেখুন। দেশে ধর্ষণচিত্র পাল্টে যাবে। ধর্ষকরা তাদের বিকৃত চিন্তা প্রয়োগের আগে শতবার ভাববে।

ইসলামে ধর্ষণের শাস্তি বিষয়ে কী বলে :

কোনো ব্যক্তির অনুমতি ব্যতিরেকে তার সঙ্গে যৌনসঙ্গম বা অন্য কোনো ধরনের যৌন অনুপ্রবেশ ঘটানোকে ধর্ষণ বলা হয়। আরবিতে একে বলা হয় ‘ইগতিসাব’। ইসলামে জোরপূর্বক যে কোনো যৌন সম্পর্ক স্থাপন কিংবা স্থাপনের চেষ্টাকারীকে দেখা হয় ‘মুহাররিব’ হিসেবে, বলা যেতে পারে— রাষ্ট্র ও আল্লাহর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণাকারী, তা ধর্ষণ অথবা সমকাম কিংবা বিসমকাম যা-ই হোক না কেন।

ধর্ষণের ক্ষেত্রে এক পক্ষ থেকে ব্যভিচার সংঘটিত হয়। আর অন্য পক্ষ হয় মজলুম বা নির্যাতিত। তাই মজলুমের কোনো শাস্তি নেই। শুধু জালিম বা ধর্ষণকারীর শাস্তি হবে। ধর্ষণের ক্ষেত্রে তিনটি বিষয় সংঘটিত হয় — এক. ব্যভিচার, দুই. বল প্রয়োগ, তিন. সম্ভ্রম লুণ্ঠন।

এ প্রসঙ্গে হযরত ওয়াইল ইবনে হুজর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে এক মহিলাকে জোরপূর্বক ধর্ষণ করা হলে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ধর্ষিতাকে কোনরূপ শাস্তি দেননি, তবে ধর্ষণকারীকে হদ্দের শাস্তি দেন।” (সুনান ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২৫৯৮, সুনানে তিরমিযি, হাদীস:১৪৫৩)

অন্যত্র প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, অর্থাৎ অবিবাহিতের ক্ষেত্রে শাস্তি এক শত বেত্রাঘাত এবং এক বছরের জন্য দেশান্তর। আর বিবাহিত পুরুষ-নারীর ক্ষেত্রে একশত বেত্রাঘাত ও রজম (পাথর মেরে মৃত্যুদন্ড)। (সহীহ মুসলিম,হাদিস:১৬৯০)null

উপরোক্ত হাদীসের আলোকে ইমাম আবু হানাফা, শাফেঈ ও আহমদ বিন হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহিম বলেন, ধর্ষণের জন্য ব্যভিচারের শাস্তি প্রযোজ্য হবে। তবে ইমাম মালেক রহমাতুল্লাহি আলাইহি নিম্নোক্ত আয়াতের আলোকে বলেন, যেহেতু ধর্ষণের মধ্যে ব্যভিচারের পাশাপাশি মুহারাবাও (বল প্রয়োগ/ ভীতি প্রদর্শন) পাওয়া যায়, তাই ধর্ষণের অপরাধে ব্যভিচারের শাস্তির পাশাপাশি ‘মুহারাবা’র শাস্তি প্রয়োগ করা হবে। ‘মুহারাবা’ হলো অস্ত্র দেখিয়ে বা অস্ত্র ছাড়াই ভীতি প্রদর্শন করে ডাকাতি করা কিংবা লুণ্ঠন করা। এককথায়, ‘মুহারাবা’ হলো পৃথিবীতে অনাচার সৃষ্টি, লুণ্ঠন, নিরাপত্তা বিঘ্নিতকরণ, ত্রাসের রাজ্য কায়েম করা ইত্যাদি। সমাজ থেকে ধর্ষণ নির্মূল করার লক্ষ্যে এই শাস্তি প্রয়োগ করা জরুরি। (আল মুগনি : ৮/৯৮;বিধিবদ্ধ ইসলামি আইন,১/ধারা-১৩৪)

‘মুহারাবা’র শাস্তির প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, অর্থাৎ ‘যারা আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে এবং দুনিয়ায় ধ্বংসাত্মক কাজ করে বেড়ায়, তাদের শাস্তি হচ্ছে : তাদের হত্যা করা হবে অথবা শূলে চড়ানো হবে বা তাদের হাত-পা বিপরীত দিক থেকে কেটে দেওয়া হবে কিংবা দেশ থেকে নির্বাসিত করা হবে। এটি তাদের পার্থিব লাঞ্ছনা, আর পরকালে তাদের জন্য রয়েছে কঠিন শাস্তি।’ ( সূরা মায়িদা, আয়াত : ৩৩) আর যদি ধর্ষণের সঙ্গে হত্যাজনিত অপরাধ যুক্ত হয়, তাহলে ঘাতকের একমাত্র শাস্তি মৃত্যুদন্ড।

মোটকথা— ধাপ অনুসারে ধর্ষকের শাস্তি হলো, বেত্রাঘাত, দেশান্তর বা নাগরিকত্ব বাতিল, পাথর মেরে হত্যা বা মৃত্যুদন্ড প্রদান করা।

বিবস্ত্র বাংলাদেশ

বর্তমানে ধর্ষণের হার অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির কিছু কারন :

বর্তমানে ধর্ষণ অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। এর মাঝে তথ্যানুসন্ধান করে দেখা গেছে ধর্ষণ প্রবণতা বৃদ্ধি পাবার মূল কারণগুলো হলো— নগ্নতা, অতৃপ্ত যৌন আকাঙ্খা, বেহায়াপনা, অবাধ যৌনাচার, রাস্তার পাশে দেয়ালে নগ্ন পোস্টার, ফুটপাতে অশ্লীল ছবি সম্বলিত যৌন উত্তেজক অবৈধ বইয়ের রমরমা ব্যবসা, অশ্লীল পত্র-পত্রিকা, অশ্লীল ছায়াছবি প্রদর্শন, বাংলা চলচ্চিত্রে খলনায়ক কর্তৃক নারীকে জোরপূর্বক ধর্ষণের দৃশ্য, ইন্টারনেটে অশ্লীল সাইটগুলো উম্মুক্ত করে দেওয়া, প্রেমে ব্যর্থতা, নেশাজাত দ্রব্য সেবন, বিয়ের বয়স পেরিয়ে গেলেও ছেলে-মেয়েদের বিবাহ না দেওয়া, প্রশাসনের উদাসিনতা ইত্যাদি কারণে আজ যুবসমাজ দিন দিন ধর্ষণ প্রবণ হয়ে উঠছে। বৃদ্ধি পাচ্ছে ধর্ষণপ্রবণতা।

এ প্রসঙ্গে কথা সাহিত্যিক ও মনোবিজ্ঞানী মোহিত কামাল বলেন, আমাদের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে আমাদের বিবেক। বিবেককে চাপিয়ে যখন প্রবৃত্তি প্রভাব বিস্তার করে তখন ভোগবাদী সত্তা আধিপত্য বিস্তার করে। ধর্ষকরা শুধু নারীলোলুপ নয়; তাই যদি হতো তাহলে তারা শিশুদের ধর্ষণ করত না। প্রথমত: তারা অবদমিত কাম চরিতার্থ করতে চায়। দ্বিতীয়ত: নারীর প্রতি প্রভুত্ব বা ক্ষমতা দেখাতে চায়, তৃতীয়ত: নারীকে ভোগের বস্তু মনে করে। নারী যে বোনের মমতা, মায়ের ভালোবাসা ও শ্রদ্ধায় মেশানো একজন মানুষ, সেটা এদের মন থেকে সরে গিয়ে শুধু ভোগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

অনুরুপভাবে ব্যভিচারকেও ইসলাম অশ্লীল ও নিকৃষ্ট কাজ ঘোষণা করেছে। পাশাপাশি এর জন্য পার্থিব ও অপার্থিব শাস্তি রয়েছে। শরিয়তে ব্যভিচারী বিবাহিত হলে তার শাস্তি রজম বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদন্ড। আর অবিবাহিত ব্যভিচারী ও ব্যভিচারিণীকে ১০০ বেত্রাঘাত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হচ্ছে- অর্থাৎ “ব্যভিচারী নারী ও ব্যভিচারী পুরুষ; তাদের প্রত্যেককে একশ’ করে বেত্রাঘাত কর। আল্লাহর বিধান কার্যকর করণে তাদের প্রতি যেন তোমাদের মনে দয়ার উদ্রেক না হয়, যদি তোমরা আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাসী হয়ে থাকো। মুসলমানদের একটি দল যেন তাদের শাস্তি প্রত্যক্ষ করে।” ( সূরা নূর,আয়াত: ২)

তবে এই শাস্তি প্রয়োগ করবে ইসলামী রাষ্ট্রের সরকার ও প্রশাসন। আর কোনো কারণে যদি এই শাস্তি আরোপিত না হয় তবে দুনিয়ায়ই কোনো না কোনোভাবে এর শাস্তি এসে যেতে পারে। হাদিস শরিফে এসেছে, ‘ব্যভিচারের মন্দ পরিণাম ছয়টি। তিনটি দুনিয়ায় আর তিনটি আখিরাতে। দুনিয়ার তিনটি হলো- ১. চেহারার সৌন্দর্য নষ্ট হওয়া, ২. দারিদ্রতা, ৩. অকাল মৃত্যু। আর আখিরাতের তিনটি হলো-১. আল্লাহর অসন্তুষ্টি, ২. হিসাব-নিকাশের কঠোরতা ও ৩. জাহান্নামের কঠিন শাস্তি। (ইসলামের দৃষ্টিতে অপরাধ, ই.ফা. পৃ:১০৯)

মোদ্দাকথা হচ্ছে, বাংলাদেশে অধুনা ধর্ষণ, বলাৎকারের মতো ঘটনা বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ সামাজিক অবক্ষয়, বিচারহীনতা, পর্দাহীনতা বা অশ্লীলতা। তবে আইনি প্রতিকার ও ন্যায়বিচার না থাকাটাই এর জন্য প্রধানত দায়ী। একশ্রেণীর অর্থলোভী পুলিশ ও শক্তিশালী ধর্ষকদের দাপটে অস্থির হয়ে উঠেছে দেশ। বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সর্বোচ্চ শিক্ষাঙ্গনে ধর্ষণের সেঞ্চুরী হয়। তারপরও ধর্ষক বুক ফুলিয়ে রাস্তা-ঘাটে হাঁটে। অথচ এদেশের সরকার ও প্রধান বিরোধীদলসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নারীদের অবস্থান হওয়া সত্বেও সরকার পারেনি ধর্ষণকারীদের উপযুক্ত শাস্তি দিতে। তাহলে কীভাবে এ দেশের অসহায় নারীরা ধর্ষণের হাত থেকে রেহায় পাবে? আদতে এই যে অপরাধ দমনে ব্যর্থতা, তা মূলত শাসনযন্ত্রের। যদি এই শাস্তিগুলো প্রকাশ্যে দেওয়া হয় (রজম ও বেত্রাঘাত), সমাজে এর একটা দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া হয়।

মানুষ প্রকাশ্যে এই শাস্তি প্রত্যক্ষ করে একটা বার্তা পায় যে, এই অপরাধ করলে এভাবেই প্রকাশ্যে ভয়াবহ শাস্তি পেতে হবে। শাস্তিপ্রাপ্ত ব্যক্তি তো সাজা পাচ্ছেই, তার নাম-পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়ার ফলে এটি তার পরিবারের জন্যও অপমানজনক একটি ব্যাপার। ইসলামী শরিয়ত কর্তৃক নির্ধারিত এই হদ (শাস্তি) বাস্তবায়ন হলে সমাজ থেকে ধর্ষণ ও ব্যভিচারের মত অপরাধগুলো নির্মূল হয়ে যেতে বাধ্য।

পরিশেষে বলা যায় যে, ধর্ষণ বন্ধ করতে শরীয়া আইনী,ক্রস ফায়ার বা জনসমূক্ষে হত্যা এর মতো কঠোর আইন প্রয়োগের পাশাপাশি ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার প্রতি আমাদের ছেলে-মেয়ে ও যুব সমাজকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে এবং গড়তে হবে আত্মশুদ্ধি ও তাকওয়া ভিত্তিক সমাজ।

সূত্র : কুরআন, হাদীস, জাতীয় এবং বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমের বিশেষ করে ডয়চে ভেলে, প্রথম আলো, দৈনিক পূর্বকোন, কালের কন্ঠ, পাবলিক ভয়েস সহ বিভিন্ন বিশ্লেষণের বিশেষ বিশেষ অংশ এবং আমার কিছু কথা।

 

 

Leave a Reply