পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিজেই এখন মানসিক রোগী। আবার কিছু সুস্থ্য রোগীর আর্তনাৎ……….।

পাবনা মানসিক হাসপাতাল নিজেই এখন মানসিক রোগী। আবার কিছু সুস্থ্য রোগীর আর্তনাৎ……….।

মোঃ রেজাউল করিম বাবু, পাবনা জেলা প্রতিনিধিঃ-

পাবনা মানসিক হাসপাতাল দেশের এক অনন্য নাম। মানসিক রোগের জন্য দেশের প্রথম বিশেষায়িত হাসপাতাল “পাবনা মানসিক হাসপাতাল” কিন্তু কালের বিবর্তনে এখন নিজেই নানা সমস্যায় ভুগছে। ধার করা চিকিৎসক দিয়ে চলছে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা। কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট, অনিয়ম-দুর্নীতি, যন্ত্রপাতির অভাবসহ নানা কারণে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে হাসপাতালের কার্যক্রম। এক কথায় বলা যায় হাসপাতালটি নিজেই এখন মানসিক রোগী।

হাসপাতালটির গোড়াপত্তনের কথা জানা যায়, দেশের মানসিক রোগীদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের লক্ষ্যে ১৯৫৭ সালে শীতলাই হাউসে অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয় পাবনা মানসিক হাসপাতাল। স্থাপনের দুই বছর পর ১৯৫৯ সালে হাসপাতালটি হেমায়েতপুরে ১১১ দশমিক ২৫ একর জায়গার ওপর স্থানান্তর করা হয়। প্রাথমিক অবস্থায় হাসপাতালের শয্যাসংখ্যা ছিল ৬০টি। পরে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০০টিতে। বর্তমানে এই হাসপাতালটিতে মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক দিয়ে ৫০০ শয্যার বিশেষায়িত এই হাসপাতালের কার্যক্রম চলছে। হাসপাতালে চিকিৎসকদের মোট পদ সংখ্যা ৩০টি। এর মধ্যে ১৭টিই দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের চারটি পদের মধ্যে তিনটিই শূন্য। ফলে মহাবিপর্যয়ের মধ্যে পড়েছেন মানসিক রোগীদের অভিভাবকরা।

হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, বহির্বিভাগে যেসব রোগী চিকিৎসাসেবা নিতে আসে তাদের বেশির ভাগই ভর্তিযোগ্য। কিন্তু আসন স্বল্পতার কারণে তাদের ভর্তি করা সম্ভব হয় না। এর সঙ্গে আছে চিকিৎসক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সংকট।

হাসপাতাল প্রশাসন জানিয়েছে, বর্তমানে হাসপাতালের ৬৪৩টি পদের মধ্যে ১৯১টিই শূন্য। মাত্র ১৩ জন চিকিৎসক দিয়ে চলছে রোগীদের স্বাস্থ্যসেবা। ফলে কাজ চালানোর জন্য বাধ্য হয়ে পাবনা মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকদের কেউ কেউ এখানে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন।

হাসপাতালের প্রশাসন থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুসারে আরো জানা যায়, হাসপাতালের সিনিয়র কনস্যালট্যান্টের দুটি ও ক্লিনিক্যাল সাইকিয়াট্রিস্টের একটি পদে দীর্ঘদিন ধরে কেউ যোগদানই করছেন না। অন্য পদের মধ্যে মেডিক্যাল অফিসারের একটি, সাইকিয়াট্রিক সোশ্যাল ওয়ার্কারের একটি, সহকারী রেজিস্ট্রারের দুটি, ডেন্টাল সার্জনের একটি, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্টের দুটি পদ দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে।

হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মাসুদ রানা সরকার জানান, অনেকে এই হাসপাতালে দীর্ঘদিন থাকতে চান না। আবার অনেকে প্রশিক্ষণ বা অন্য কারণে দীর্ঘ ছুটিতে চলে যান। ফলে চিকিৎসকদের ঘাটতি থেকেই যায়। তবে জরুরি ভিত্তিতে পাবনা মানসিক হাসপাতালের শূন্যপদগুলোতে চিকিৎসক নিয়োগ দেওয়া উচিত বলে মনে করছেন তিনি।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার রায় বলেন, গুরুত্বপূর্ণ এই পদগুলো খালি থাকায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। তবে জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।

এদিকে গত শুক্রবার (৯ অক্টোবর) হাসপাতালটিতে সরেজমিনে দেখা যায় ১ নম্বর ওয়ার্ডের সামনে গ্রিলের ভেতরে দাঁড়ানো মাসুম নামের এক রোগী বলেন “ভাই, আমার বাড়ি কিশোরগঞ্জের মিঠামইন থানার গিরিশপুর গ্রামে। আমার বাড়ির কাউকে আপনি খবর দেবেন, যেন আমাকে এখান থেকে নিয়ে যায়”।

গতকাল শনিবার (১০ অক্টোবর) বিশ্বব্যাপী পালিত হলো “বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস”।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে মাসুমের এই আর্তনাৎ কি স্পর্শ করতে পারবে তার পরিবারের লোকদের? কিংবা তার মতো আরো কয়েকজন রয়েছে তাদের? তারা কি পারবে না ফিরে যেতে তাদের পরিবারের কাছে?

হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সুস্থ হওয়ার পরও স্বজনেরা ফিরিয়ে নেয়নি এমন অন্তত ১১ জন বছরের পর বছর হাসপাতালে আছেন। তাদের মধ্যে ঢাকার মধ্য বাসাবো এলাকার বদিউল আলম ১ নম্বর ওয়ার্ডে ১৫ বছর, মগবাজারের নয়াটোলা এলাকার সাঈদ হোসেন ১২ নম্বর ওয়ার্ডে ২৪ বছর, পাবনা পৌর এলাকার আটুয়া মহল্লার ১৩ নম্বর ওয়ার্ডে ডলি ৯ বছর, একই ওয়ার্ডে রাধানগর মহল্লার জাকিয়া সুলতানা ১১ বছর, ঢাকার শাঁখারীবাজারের শিপ্রা রানী রায় ২১ বছর, ঢাকার টিকাটুলী এলাকার ১৪ নম্বর ওয়ার্ডে শাহনাজ আক্তার ২১ বছর, ঢাকার কামরাঙ্গীর চরের ১৬ নম্বর ওয়ার্ডে নাইমা চৌধুরী ১১ বছর, কাটাসুর এলাকার গোলজার বিবি ২০ বছর এবং মোহাম্মদপুর এলাকার অনামিকা (বুবি) ২১ বছর ধরে পড়ে আছেন। খোঁজ নেয় না তাদের পরিবারে কেউ।

আরো জানা যায়, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে সম্পত্তির ভাগ-বাটোয়ারা জনিত কারণে মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হওয়া এসব রোগী সুস্থ হলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা ফিরিয়ে নিতে চায় না। পরিবারের কোনো সদস্য মানসিকভাবে ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে সমাজ স্বাভাবিকভাবে দেখে না বলেও কেউ কেউ তাদের স্বজনদের হাসপাতাল থেকে ফিরিয়ে নিতে চায় না। এ কারণে অনেক রোগীর স্বজনই হাসপাতালে ভর্তির সময় ভুল নাম বা ঠিকানা দেয়।

হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. রতন কুমার রায় জানান, হাসপাতালের নিয়ম অনুযায়ী সুস্থ হওয়ার পর স্বজনেরা নিয়ে না গেলে হাসপাতালের কর্মচারীদের দিয়ে ঠিকানা অনুযায়ী পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। ভর্তির সময় রেজিস্টারে দেয়া ঠিকানা অনুযায়ী পাঠানো হয় কিন্তু সেই ঠিকানার কোনো অস্তিত্বই নেই। আবার ঠিকানা অনুযায়ী যাদের বাড়ি খুঁজে পাওয়া গেলেও পরিবারের অন্য সদস্যরা তাদের গ্রহণ করেন না। তিনি বলেন, এই হাসপাতালে কিছু শয্যায় সুস্থ হয়ে ওঠা রোগী থাকায় নতুন রোগী ভর্তি করতে বেডের সংকট হয়।

হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মাসুদ রানা সরকার বলেন, ছাড়পত্র পাওয়ার উপযুক্ত হওয়ার পরও বছরের পর বছর ধরে হাসপাতালের ওয়ার্ডে পড়ে রয়েছেন ওই ১১ জন। চলতি বছরের মার্চ মাসে দেয়া হাসপাতালের মেডিকেল বোর্ডের সর্বশেষ পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, হতাশা ও বার্ধক্যসহ নানা কারণে তাদের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা খানিকটা অবনতি হয়েছে। মানসিক ভারসাম্যহীন এসব নারী-পুরুষ সুস্থ হওয়ার পর পরিবারের সদস্যদের কাছে ফিরে যেতে চান। কিন্তু পরিবারের সদস্যদের অনীহার বিষয়টি যখন তারা উপলব্ধি করতে পারেন, তখন তারা মারাত্মকভাবে ভেঙে পড়েন।

Author: admin

Leave a Reply