আজ বিশ্ব মান দিবস ; অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে বিএসটিআই

আজ বিশ্ব মান দিবস ; অনিয়মের মধ্য দিয়ে চলছে বিএসটিআই

মোঃ সিরাজুল মনির , ব্যুরো প্রধান, চট্টগ্রাম বিভাগ:-


মান সনদপ্রাপ্ত ও মানহীন সব প্রতিষ্ঠানের খোঁজ আছে মান নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড এন্ড টেস্ট্রিং ইনস্টিটিউট-বিএসটিআইয়ের কাছে। বৈধ প্রতিষ্ঠানের অবৈধ কার্যক্রম এবং অবৈধভাবে চলা প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানলেও নিয়মিত মাসোহারার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থায় যায় না বিএসটিআই। মাঝেমধ্যে মাসোহারা আদায়ে অনিয়ম হলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সার্ভিলেন্স টিমের অভিযান ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের আওতায় আনা হয়। তাছাড়াও বৈধভাবে ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানগুলোকে পদে পদে পোহাতে হয় নানা দুর্ভোগ। পরিস্থিতি যখন এমন চরম অনিয়মের ভরা তখন আজ দেশে পালিত হচ্ছে বিশ্ব মান দিবস।
প্রতিটি থানায় বিএসটিআইয়ের ফিল্ড অফিসার (মাঠকর্মী) রয়েছেন। সংশ্লিষ্ট থানা এলাকার প্রতিষ্ঠানগুলো তদারকিতে থাকার কথা এসব মাঠকর্মীর। তবে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এসব মাঠকর্মীর। চেইন মেনে সে মাসোহারার ভাগ যায় উধ্বর্তন কর্তা পর্যন্ত।
কোনো কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করা না গেলে পণ্য যতই ভালো হোক মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারে না। টাকার পরিমাপের উপর পণ্যের মান ঠিক করে বিএসটিআই এমন অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। এমনকি টাকা দিলে নমুনা না দিয়েও ফলাফল পাওয়া যায় বলে অভিযোগ আছে। বৈধভাবে নানা হয়রানি শিকার হলেও অবৈধ প্রতিষ্ঠান পরিচালনায় সহায়তা করে বিএসটিআই। মাসোহারা পাওয়াতে এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না। উল্টো প্রতিবছর এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানের সাথে সভায়ও বসে প্রতিষ্ঠানটি।

এ বিষয়ে কনজুমার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) কেন্দ্রীয় সহ সভাপতি ও চট্টগ্রাম বিভাগীয় সভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, লেনদেনের উপরেই পণ্যের মান ঠিক হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে যখন বসে মিটিং হয়, পরবর্তীতে সে সকল প্রতিষ্ঠানে কোনো অভিযান হয় না। এতে নিয়মিত মাসোহারা আদায়ের বিষয়টি স্পষ্ট হয়। একই এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে অভিযান হয়, অন্যগুলো বাদ যায় কেন? সর্ষের মধ্যে ভূত আছে। বিএসটিআই মান রক্ষায় চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে।
তিনি বলেন, বিএসটিআইয়ের এমন উদাসীনতায় ভোক্তারা প্রতারিত হচ্ছে, শারীরিক ও আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এখন পরিস্থিতি এমন হয়েছে আগে বিএসটিআইয়ের মান ঠিক করতে হবে। বিএসটিআইয়ে শুদ্ধি অভিযান দরকার। একই জায়গায় এক যুগ ধরে কর্মরত এমন কর্মকর্তা বিএসটিআইয়ে আছে। বিএসটিআই নিজেদের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করবে এটা আমি প্রত্যাশা করি।
বিএসটিআইয়ের চরম ব্যর্থতার কারণে বাজার ভেজাল ও নিম্নমানের বা মানহীন পণ্যে ভরে গেছে। প্রতিবছর বিশ্ব মান দিবসকে সামনে রেখে অভিযানে নামে বিএসটিআই। এবারও দিবসের কয়েকদিন আগে থেকে প্রশ্নবিদ্ধ অভিযান পরিচালনা করেছে সংস্থাটি। জেলা প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনের সহায়তায় যেমন অভিযান হয়েছে তেমনি নিজস্ব সার্ভিলেন্স অভিযানও হয়েছে। এসব অভিযান প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার মূলে রয়েছে টার্গেট প্রতিষ্ঠানে প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিএসটিআই। অবৈধ ও মানহীন প্রতিষ্ঠানের তালিকা থাকার পরও শুধু মাসোহারা না দেওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্য করেই চালানো হয়েছে অভিযান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একটি বেকারি প্রতিষ্ঠানের সত্ত্বাধিকারী বলেন, তালিকা করে সবার কাছ থেকেই মাসোহারা আদায় করে। আপনি যতই ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করেন, টাকা ছাড়া সেটা পরিক্ষায় উত্তীর্ণ হবে না। আবার লাইসেন্স নিলেন সেটা নিবায়ন করতে হবে। কিছুদিন পর পর সার্ভিলেন্স টিম আসবে। একটা মাসোহারা দিলে কোনো টেনশন নেই। এমনকি লাইসেন্স না থাকলেও সমস্যা নেই। বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠান তাই মান সনদ না নিয়েই ব্যবসা করছে।

নির্ধারিত পণ্যের উৎপাদন বা বাজারজাত করার ক্ষেত্রে মান সংস্থা বিএসটিআই থেকে অনুমতির প্রয়োজন পড়ে। শতভাগ মান নিশ্চিত করা গেলে তখনই মান সনদ পাওয়ার কথা। আবার মান সনদ পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠান উৎপাদনে গেলেও সেটা বিএসটিআইয়ের তদারকিতে থাকার কথা। বাস্তবে মাসোহারা আদায় ছাড়া কোনো তদারকি নেই বিএসটিআইয়ের। বিএসটিআইয়ের সনদ প্রাপ্তি থেকে শুরু করে প্রতিটি পদে পদে টাকার লেনদেন করতে হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসটিআই চট্টগ্রামের পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার মো. সেলিম রেজা বলেন, অন্যান্য সময়েও আমাদের অভিযান হয়, ডকুমেন্ট দেখেন সব সময় কমবেশি অভিযান হয়েছে। এবার আমরা একটু আলাদাভাবে করেছি। মাসোহারার বিষয়টা আগেও বলেছেন। কে মাসোহারা নেয় সেটা বলেন, কে করে। অভিযানগুলো যখন হয় তখন সময় স্বল্পতার কারণে হয়তো একটা দুইটার বেশি প্রতিষ্ঠানে যেতে পারে না। আমাদের অফিসের অন্যান্য কাজও থাকে। তবে একেবারেই পাশাপাশি হলে সেখানে যায় না সেটা মনে হয় ঠিক না। তারপরও কোনো একটা নিদিষ্ট করে বললে আমি সেটার খবর নিব।

এদিকে বাজারে মানহীন পণ্যের ছড়াছড়ির মধ্যে আজ পালন করা হচ্ছে বিশ্ব মান দিবস। বিশ্বের ৩টি প্রধান আন্তর্জাতিক মান সংস্থার যৌথ উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর এ দিবসটি পালিত হয়। বাংলাদেশের জাতীয় মান সংস্থার পক্ষ থেকে দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে বিশ্বের ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা বিশ্বব্যাপী পণ্য-সেবার মান বজায় রাখার জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নির্ধারক সংস্থার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন। পরের বছর থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ঐ দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতেই এ দিবস বৈশ্বিকভাবে পালন করা হয়। প্রত্যেক বছরই দিবসের প্রতিপাদ্য বিষয় চলমান বিষয়াদিকে ঘিরে নির্ধারণ করা হয়। ১৯৭০ সাল থেকে আইএসও এই দিনটি পালন করে আসছে। বিএসটিআই ১৯৭৪ সালে আইএসও সদস্যপদ লাভ করে। আইএসও’র সক্রিয় সদস্য হিসাবে বিএসটিআই দিবসটি পালন করে আসছে। এবার দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করা হয়েছে ‘পৃথিবী সুরক্ষায় মান’। দিবসটি উপলক্ষে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউস মিলনায়তনে আলোচনা সভার আয়োজন করেছে বিএসটিআই।

Author: admin

Leave a Reply