২০০৫ সালে লওতারো মার্তিনেজ কিংবা হোয়াকিন কোরেয়ার বয়স কত ছিল?

গুগল বলছে, মার্তিনেজের বয়স তখন আট। বাস্কেটবল অধ্যুষিত বাহিয়া অঞ্চল থেকে উঠে আসা শিশু-মার্তিনেজের চোখেমুখে তখন বাবার মতো ফুটবলার হওয়ার স্বপ্ন। ওদিকে কোরেয়া লওতারোর চেয়ে বছর তিনেকের বড়। বুয়েনেস এইরেসের বিখ্যাত ক্লাব রিভার প্লেটের বয়সভিত্তিক দলে মাত্র নেওয়া শুরু করেছেন ফুটবলের পাঠ। এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলের দূরত্ব বেশ, সাড়ে ছয় শ’ কিলোমিটার অতিক্রম করতে দিনের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সময় কেটে যায়। এত দূরে থাকা এই দুই শিশুকে মিলিয়ে দিয়েছিল একটা জিনিস— ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা। দুনিয়ার সব বিনোদন আটকে রাখা চার কোণার ওই বাক্সে আকাশি-সাদা জার্সিধারীদের খেলা হলেই চোখ আটকে যেত পাক্কা নব্বই মিনিট। ওই নব্বই মিনিটে হাজারো স্বপ্নের আনাগোনাও কী হতো না মার্তিনেজ-কোরেয়াদের মনে? টিভি সেটে রিকেলমে, জানেত্তি কিংবা ক্রেসপোদের খেলা দেখে হয়তো ভাবতেন, ‘একদিন আমিও…’

পনেরো বছরে এত কিছু হয়ে গেলেও, একটা জিনিস অপরিবর্তিতই ছিল এত দিন। বলিভিয়ার মাঠে আর্জেন্টিনার হতাশা-কাব্য। সময় পেরোনোর সঙ্গে সঙ্গে যে কাব্যে যুক্ত হয়েছে নতুন নতুন অধ্যায়। ডিয়েগো ম্যারাডোনার আর্জেন্টিনা মুখ লুকিয়েছে ৬-১ গোলে হারার পর, হারের গ্লানি সঙ্গী হয়েছে এদগার্দো বাউজার আর্জেন্টিনারও। মাঝে আলেহান্দ্রো সাবেয়া কোনোরকমে ড্র নিয়ে ফিরেছিলেন। প্রত্যেকের দলের মূল কান্ডারি ছিলেন লিওনেল মেসি। ছয়বারের বিশ্বসেরা এই তারকা লা পাজে এলেই যেন কেমন ম্লান হয়ে যেতেন।

সেই মেসির মুখেই ম্যাচ শেষে নির্ভার হাসি। একে একে সব খেলোয়াড় আর কর্মকর্তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বোঝাই গেল, বলিভিয়ার বিপক্ষে এই জয়টা মেসির কাছে কতটা প্রার্থিত ছিল। এই একটি অপ্রাপ্তি গত দেড় দশক ধরে কতটা কুরে কুরে খাচ্ছিল মেসিকে, খাচ্ছিল আর্জেন্টিনাকে—বলিভিয়ার মাটিতে কিছুতেই জয় আসছিল না।

লা পাজ জয় করল আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার জন্য জয়টা ছিল আবেগের।
ছবি: রয়টার্স

উচ্চতার নামের অদৃশ্য এই শত্রুকে হারাতে স্কালোনি যে খুব বেশি পরিবর্তন এনেছিলেন, তা কিন্তু নয়। লাতিন আমেরিকার উচ্চতার বাধা জয় করতে প্রয়োজন এমন এক গোলরক্ষক, যে নিজ মহাদেশে খেলেই অভ্যস্ত— হয়তো স্কালোনির এমন কোনো ভাবনা থেকেই এই ম্যাচে গোলবারের নিচে নিজের জায়গা ধরে রেখেছিলেন রিভার প্লেটের ফ্রাঙ্কো আরমানি। অভিষেক হয়নি প্রিমিয়ার লিগে দুর্দান্ত খেলা এমিলিয়ানো মার্তিনেজের। তবে ম্যাচের গোটা সময়ে আরমানির পাগলাটে খেলা দেখে মনে হলো না, তাঁর জায়গায় এমিলিয়ানো মার্তিনেজ নামলে খুব বেশি খারাপ করতে পারতেন। এর আগে বলিভিয়ার কাছে এই লা পাজেই ছয় গোল খাওয়ার পর মেসি বলেছিলেন, এ মাঠে বলের বাউন্স বোঝা যায় না। তিড়িং বিড়িং করে লাফিয়ে কোনোদিকে যে চলে যায়, ঠাওর করা যায় না। অন্তত প্রথমার্ধে বলের ওই স্বভাব ভর করল আরমানির ওপরেও। ২৪ মিনিটে বলিভিয়ার প্রথম গোল, কিংবা তাঁর আগে অধিনায়ক মার্সেলো মার্তিনস মোরেনোর দুটি সহজ সুযোগে আরমানির পাগলাটে মুভমেন্ট চিন্তায় ফেলে দেবে যেকোনো আর্জেন্টাইন সমর্থককে।

ইকুয়েডরের বিপক্ষে গত ম্যাচে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ যেমন খেলেছিল, এ ম্যাচেও তেমনই দেখা গেছে। লুকাস মার্তিনেজ কারা ও নিকোলাস তালিয়াফিকো জাত চিনিয়েছেন। মোটামুটি কাজ চালানোর পারফরম্যান্স ছিল ওতামেন্দিরও। গত ম্যাচে রাইটব্যাকে অত ভালো না খেলা গঞ্জালো মন্তিয়েল এ ম্যাচে সুযোগ পেয়েও আক্রমণের ক্ষেত্রে নিজের মুনশিয়ানা দেখাতে ব্যর্থ। উল্টো প্রায় সময়েই বল হারিয়েছেন, সঠিক পাস দিতে গিয়ে ভিরমি খেয়েছেন। বল পায়ে দক্ষ সেন্টারব্যাক হিসেবে আর্জেন্টিনার ভবিষ্যৎ মানা হচ্ছে লুকাস মার্তিনেজ কার্তাকে। কেন মানা হচ্ছে, বোঝালেন এই ম্যাচেও। সদ্য ফিওরেন্টিনায় যোগ দেওয়া এই তারকা পেছন থেকে বেশ কয়বার লম্বা পাস পাঠাতে চেয়েছেন আক্রমণভাগে। সফল পাস দেওয়ার হারটা আরেকটু বাড়াতে পারলেই কিছুদিন পর স্কালোনি হয়তো মেসির পাশাপাশি আর্জেন্টিনার মূল একাদশে মার্তিনেজ কার্তার নামটাও সবার আগে লিখবেন।

রক্ষণভাগে সবচেয়ে ভালো খেলেছেন লেফটব্যাক তালিয়াফিকো। প্রায় সময়ে ওপরে উঠে গিয়েছেন রক্ষণ সামলে। একাদশে জায়গা পাওয়া নতুন মিডফিল্ডার এজেকিয়েল পালাসিওস কিংবা সামনে থাকা লুকাস ওকাম্পোস— সবার সঙ্গেই বোঝাপড়া চোখে পড়েছে এই আয়াক্স তারকার। মার্কোস আকুনিয়ার জায়গায় পালাসিওস নেমে আলো ছড়িয়েছেন সবচেয়ে বেশি। তাঁর খেলা দেখে কে বলবে খেলাটা যে ভূপৃষ্ঠ থেকে এত ওপরে হচ্ছে? চতুর পাস আদান-প্রদানে প্রায়াই আর্জেন্টিনার আক্রমণ গড়েছেন, সবচেয়ে বড় কথা, গোটা নব্বই মিনিটে তাঁর খেলা দেখে একটি বারের জন্যও মনে হয়নি তিনি হাঁপিয়ে গিয়েছেন। লা পাজে খেলার জন্য দমটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি, যেটি খুব ভালোই আছে তাঁর।

না, আর্জেন্টিনা যে নিখুঁত ম্যাচ খেলেছে, কোনোভাবেই বলা যাবে না। তবে যা-ই খেলেছে, বলিভিয়াকে হারানোর জন্য সেটাই ছিল দরকারি। ৩৩ বছর বয়সে এসে মেসি বুঝেছেন, এত উঁচু মাঠে যেখানে নিশ্বাস নিতেই ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা হয়, সেখানে গোটা নব্বই মিনিট হৃদয় নিংড়ে একাই গোল কিংবা অ্যাসিস্ট করতে চাওয়ার চেয়ে সুযোগসন্ধানী খেলাই ভালো। গোল করার জন্য লওতারো মার্তিনেজ সুযোগ পাচ্ছিলেন বেশ। মাঠে থাকা মেসির চোখে কি আর সেটা পড়েনি! সেটা দেখেই হয়তো মেসি খেললেন কার্যকরী ফুটবল। যতটুকু দৌড়ালে নব্বই মিনিট ধরে নিজের প্রাণশক্তি বজায় রাখা যায়, ঠিক সেভাবেই খেললেন। তাতে লাভ হলো মার্তিনেজ, কোরেয়াদের। দ্বিতীয়ার্ধে বেশ কয়েকবার স্ট্রাইকারদের বল বানিয়ে দিলেন মেসি, সে সব পাসগুলোর মধ্যে একটা থেকেই খুলল জয়ের দুয়ার।

আর তাতেই দেড় দশক পর লা পাজে আর্জেন্টিনায় বশ মানল স্বাগতিকেরা।

Leave a Reply