চট্টগ্রাম ওয়াসার আত্মঘাতী সিদ্ধান্তে হালদা ধ্বংস হয়ে যাবে।

মোঃ সিরাজুল মনির, ব্যুরো প্রধান, চট্টগ্রাম বিভাগ:-

মোহরা ও মদুনাঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে হালদা নদী থেকে দৈনিক ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে নগরীতে সরবরাহ দেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। এরইমধ্যে মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীতে পানি সরবরাহ দিতে আরো একটি নতুন প্রকল্প নিচ্ছে সরকারের সেবা সংস্থাটি। হালদা থেকে দৈনিক পানি ১৪ কোটি লিটার উত্তোলন করে সরবরাহ করা হবে এই প্রকল্পে। বিপুল এই পানি উত্তোলন করা হলে হালদার মৃত্যু ডেকে আনা হবে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞগণ। চট্টগ্রাম মৎস্য দপ্তরও এ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। অথচ প্রকল্পটির স্বপক্ষে আইডব্লিউএম (ইনস্টিটিউট অব ওয়াটার মডেলিং) রিপোর্ট জমা দিয়েছে।

হালদা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রিপোর্ট দেওয়ার আগে হালদার নদীর ইকোলজিক্যাল ফ্লো নির্ধারণ করতে হবে। নদীর জীববৈচিত্র্য রক্ষা, ডলফিনের বিচরণ এবং রুই জাতীয় মাছের প্রজননের জন্য কী পরিমাণ পানি প্রয়োজন সেটি আগে নির্ধারণ করা দরকার। এরপর অতিরিক্ত পানি থাকলে তা উত্তোলনের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে। তাছাড়া ২০১৬ সালে প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত এর নেতৃত্বে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ^বিদ্যালয় (বুয়েট), বাংলাদেশ কৃষি বিশ^বিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ^বিদ্যালয় সমন্বয়ে একটি বিশেষজ্ঞ টিম হালদা নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম চালায়। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত ওই গবেষণায় হালদায় পানি সংকট উল্লেখ করে বলা হয়, ভূজপুর রাবারড্যাম, হালদার বিভিন্ন শাখা খালের মুখে স্থাপিত ১৬টি স্লুইচগেট ও প্যারালাল খাল প্রজেক্টের কারণে নদীর জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। এসব স্থাপনার কারণে হালদার পানির স্রোত আটকে যাচ্ছে। তাই এগুলো অপসারণ করে পানি ফ্লো বৃদ্ধির জন্য রিপোর্টে সুপারিশ করা হয়। তাছাড়া অতীতে ১১টি বাঁক কেটে দেওয়ার কারণে হালদার দৈর্ঘ্য ২৫ কিলোমিটার কমে গেছে। আগে নদীর দৈর্ঘ্য ছিল ১২৩ কিলোমিটার। বর্তমানে আছে ৯৮ কিলোমিটার। এ কারণে নদীর পানি ধারণ ক্ষমতাও হ্রাস পেয়েছে। এছাড়াও চট্টগ্রাম ওয়াসার মোহরা ও মদুনাঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে হালদা থেকে পানি উত্তোলন করা হচ্ছে। এ কারণে শুষ্ক মওসুমে নদীতে লবণাক্ত পানি প্রবেশ করে থাকে। তাই নতুন কোন প্রকল্প গ্রহণ করলে এসব বিষয় মাথায় রেখে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞ টিমের এসব সুপারিশ এড়িয়ে গিয়ে হালদা থেকে দৈনিক আরো ১৪ কোটি লিটার পানি উত্তোলনে ওয়াসার প্রস্তাবিত প্রকল্পের পক্ষে গত সেপ্টেম্বরে রিপোর্ট দেয় আইডব্লিউএম। এ নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে ছাড়পত্র নিতে গেলে আইডব্লিউএম’র রিপোর্টের বিষয়ে বিভিন্ন ত্রুটি উঠে আসে।

আইডব্লিউএম এর রিপোর্টে উল্লেখ করা যে, ফেব্রুয়ারিতে হালদাতে প্রতি সেকেন্ডে পানি ফ্লো থাকে ৩১৭ দশমিক ২ কিউবিক মিটার। নভেম্বরে থাকে ৩৮৪ দশমিক ৭ কিউবিক মিটার। সারা বছর হালদা নদীতে পানির যে ফ্লো থাকে তা থেকে মাত্র ১ দশমিক ৩ শতাংশ পানি উত্তোলন করা হবে। সুতরাং এ নিয়ে নদীর জীববৈচিত্র্য এবং মাছের কোন ক্ষতি হবে না।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, হালদা থেকে মোহরা ও মদুনাঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্পের মাধ্যমে দৈনিক ১৮ কোটি লিটার পানি উত্তোলনের পরও চাহিদা মেটাতে রাঙ্গুনিয়ার পোমরা এলাকায় কর্ণফুলী নদী থেকে দৈনিক আরো ১৪ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করে ওয়াসা। এর মধ্যে মিরসরাইয়ে বাস্তবায়নাধীন বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীর পানির প্রয়োজন হলে নতুন একটি প্রকল্প গ্রহণ করছে ওয়াসা। এটির দৈনিক উৎপাদন হবে ১৪ কোটি লিটার। মোহরা পানি শোধনাগার প্রকল্প স্থাপনার পাশে এ প্রকল্পটি তৈরি হবে। প্রকল্পের উৎপাদিত পানি প্রায় ৬৫ কিলোমিটার পাইপলাইনের মাধ্যমে মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীতে সরবরাহ করা হবে। কিন্তু বর্তমান ১৮ কোটি লিটারের সাথে নতুন প্রকল্পের আরো ১৪ কোটি লিটার যোগ হলে হালদা থেকে দৈনিক পানি উৎপাদন হবে ৩২ কোটি লিটার। বিপুল এ পানি উত্তোলন হলে হালদার মৎস্য প্রজনন, জীববৈচিত্র্য এবং মোহরা ও মদুনাঘাট পানি সরবরাহ প্রকল্প হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কা রয়েছে। তাছাড়া হালদাকে বঙ্গবন্ধু হ্যারিটেজ ঘোষণার প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। এ অবস্থায় অতিরিক্ত পানি উত্তোলন হলে হালদা বড় ধরনের বিপর্যয়ে পড়বে।

এদিকে আইডব্লিউএম’র রিপোর্টটি নিয়ে গত ১৩ অক্টোবর পরিবেশ অধিদপ্তর, চট্টগ্রাম অঞ্চলের কার্যালয়ে হালদা সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ওই বৈঠকে আইডব্লিউএম’র পক্ষে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব মেরিন সায়েন্সের প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন।
জানতে চাইলে প্রফেসর ড. মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, ‘আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট প্রণয়নে আমি সম্পৃক্ত ছিলাম না। তাদের বিশেষজ্ঞরা এ রিপোর্ট তৈরি করেছেন। আমি শুধু ওয়াসার ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের তথ্য সংগ্রহের দায়িত্ব পালন করেছি।’
এ প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘হালদা নদীতে বর্তমানে যে পানি রয়েছে তা থেকে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তোলন করা হবে। এতে নদীর কোন ক্ষতি হবে না।’

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার ফারহানা লাভলী বলেন, ‘নানা কারণে হালদার পানি স্রোত অনেক কমে গেছে। সুতরাং হালদা থেকে নতুন করে পানি দেওয়ার কোন সুযোগ নেই। এটির বিকল্প খুঁজতে হবে। কারণ হালদাকে বঙ্গবন্ধু হ্যারিটেজ ঘোষণার প্রাক্কালে নতুন করে পানি উত্তোলন হলে হালদার ব্যাপক ক্ষতি হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।’
ফারহানা লাভলী অভিযোগ করে বলেন, ‘আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট প্রণয়নের আগে মাঠ পর্যায়ে কোন কাজ হয়নি। এমনকি আমাদের সাথেও কথা হয়নি। এটি প্রণয়নের আগে হালদা সংশ্লিষ্ট লোকজনের মতামত নেওয়া উচিত ছিল।’

পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলের পরিচালক মোয়াজ্জেম হোসেন বলেন, ‘প্রকল্পের জন্য পরিবেশের ছাড়পত্র দেওয়া আগে আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট নিয়ে হালদা সংশ্লিষ্টদের সাথে বৈঠক করেছি। তাদের মতামতের ভিত্তিতে আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট সংশোধন করতে বলেছি।’
যোগাযোগ করা হলে প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘হালদাতে বর্ষাকালে যে পরিমাণ পানি থাকে, শীততালে সেভাবে থাকে না। শীতকালে যতবেশি পানি উঠবে ততবেশি লবণ পানি ভিতরে প্রবেশ করবে। তাতে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে।’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ও হালদা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, বঙ্গবন্ধু শিল্পনগরীর জন্য পানি চাহিদা পূরণে হালদার পরিবর্তে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। বিশেষ করে ফেনী নদী, ছোট ফেনী নদী, মুহুরী প্রজেক্ট, মহামায়া লেক, সিলোনিয়া নদীসহ বিকল্প উৎস খোঁজে পানির ব্যবস্থা করতে হবে।’

প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত
আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট সংবিধানের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক

প্রখ্যাত পানি বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘৫০ বছর আগেও হালদা পুরোপুরি মিঠা পানির নদী ছিল। কিন্তু এখন হালদাতে লবণাক্ততা প্রবেশ করেছে। এ অবস্থায় আরো পানি উত্তোলন করলে নদীর জীববৈচিত্র্য নষ্ট হয়ে যাবে। বদলে যাবে মাছের ধরণ। দেশীয় মাছ কমে যাবে। ক্ষতি হবে রুই জাতীয় মাছের প্রজননে। ইদানীং হালদাতে লবণ পানি প্রবেশ করছে। বৈশি^ক জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে লবণের পানি আরো বেশি ভিতরে প্রবেশ করবে। এতে ওয়াসার দুইটি প্রকল্পেরও ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে ওয়াসাকে সমস্যায় পড়তে হবে।
হালদাতে বর্ষাকালে যে পরিমাণ পানি থাকে, শীততালে সেভাবে থাকে না। এ অবস্থায় আইডব্লিউএম’র রিপোর্টে এ বিষয় ওঠে এসেছে কিনা দেখতে হবে। কারণ শীতকালে কি পরিমাণ পানি উঠবে সেটি আমাদের বিবেচ্য বিষয়। শীতকালে যতবেশি পানি উঠবে ততবেশি লবণ পানি ভিতরে প্রবেশ করবে। তাতে নদীর জীববৈচিত্র্য হুমকিতে পড়বে। জীববৈচিত্র্য হচ্ছে জাতির সাংবিধানিক ওয়াদা। ২০১১ সনে ১৮ (ক) ধারায় বলা হয়েছে, জাতি জীববৈচিত্র্য রক্ষা করবে। এমন কিছু করবে না যাতে জীববৈচিত্র্য ক্ষতি হয়। কাজেই আইডব্লিউএম’র এ রিপোর্ট সংবিধানের সাথে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক।

চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘মিরসরাই বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীতে দৈনিক ১৪ কোটি লিটার পানি সরবরাহের জন্য একটি প্রকল্প তৈরি করছে ওয়াসা। ওই প্রকল্পের মাধ্যমে হালদা থেকে পানি উত্তোলন করে পরিশোধনের পর শিল্প নগরীতে সরবরাহ করা হবে। এজন্য আইডব্লিউএম’র একটি রিপোর্ট পাওয়া গেছে। এখন পরিবেশের ছাড়পত্রের অপেক্ষায় আছি।’
নতুন করে আরো ১৪ কোটি লিটার পানি উত্তোলন করলে হালদার ক্ষতি হবে কিনা এমন এক প্রশ্নের জবাবে প্রকৌশলী এ কে এম ফজলুল্লাহ বলেন, ‘নদীতে বর্তমানে যে পানি রয়েছে তা থেকে মাত্র ৩ দশমিক ৫ শতাংশ উত্তোলন করা হবে। এতে নদীর কোন ক্ষতি হবে না।’

ওয়াসার প্রকল্পের আইডব্লিউএম’র রিপোর্ট প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রাণিবিদ্যা বিভাগের প্রফেসর ও হালদা বিশেষজ্ঞ প্রফেসর ড. মো. মনজুরুল কিবরীয়া বলেন, ‘মিরসরাইয়ে বঙ্গবন্ধু শিল্প নগর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির সমৃদ্ধির মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। তাছাড়া হালদা নদীর মতো (প্রস্তাবিত বঙ্গবন্ধু মৎস্য হ্যারিটেজ) প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করার দায়িত্বও রাষ্ট্র ও জনগণের। কারণ হালদা নদীর মতো একটি ইউনিক নদী বাংলাদেশে একটিই রয়েছে। ইচ্ছা করলে হালদা নদীর মতো দ্বিতীয় আরেকটি সৃষ্টি করা যাবে না। সুতরাং বঙ্গবন্ধু শিল্প নগরীর জন্য পানি চাহিদা পূরণে হালদার পরিবর্তে বিকল্প উৎস খুঁজতে হবে। বিশেষ করে ফেনী নদী, ছোট ফেনী নদী, মুহুরী প্রজেক্ট, মহামায়া লেক, সিলোনিয়া নদীসহ বিকল্প উৎস খোঁজে পানির ব্যবস্থা করতে হবে।’

Leave a Reply