আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব – সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

0
24

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব – সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

বিবিসি বাংলা এর প্রতিবেদন

ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০১৬-র নির্বাচনে তার প্রচারণার সময় প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে অবৈধ অভিবাসন তিনি কমাবেন। এ ব্যাপারে তার প্রচারণার একটা মূল বক্তব্য ছিল মেক্সিকো থেকে আসা নথিবিহীন অভিবাসীরাই অবৈধ মাদক এরবং অপরাধ সহ নানাধরনের সমস্যার মূলে। চার বছরে মি. ট্রাম্প তার সেই বক্তব্যের কতটা প্রতিফলন ঘটিয়েছেন তার প্রশাসনের ব্যাপকভিত্তিক অভিবাসন নীতিতে? তথ্য সংকলন করেছেন বিবিসি নিউজের তথ্য সাংবাদিক এড লাওথার।

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব - সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

বিদেশে জন্ম নেয়া যেসব মানুষ এখন আমেরিকার বাসিন্দা তাদের সংখ্যা বেড়েছে ৩%। মি. ট্রাম্প নির্বাচনে জেতার আগের বছরে যে সংখ্যা ছিল চার কোটি ৩৭ লাখ, সেটা গত বছর বেড়ে দাঁড়িয়েছে চার কোটি ৫০ লাখ।

তবে এই জনগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যায় যারা, তাদের মধ্যে সংখ্যার যে উল্লেখজনক পরিবর্তন হয়েছে, তা কিন্তু সার্বিক সংখ্যার মধ্যে হারিয়ে গেছে। এরা হল মেক্সিকো থেকে আমেরিকায় যাওয়া জনগোষ্ঠী। এদের সংখ্যা বহু বছর ধরে প্রায় একই পর্যায়ে ছিল। কিন্তু মি. ট্রাম্পের নির্বাচনের পর মেক্সিকোয় জন্ম নেয়া যারা আমেরিকায় বাস করছেন, তাদের সংখ্যা দ্রুত ক্রমাগত কমেছে।

তবে, তাদের সংখ্যা হ্রাস পুষিয়ে দিয়েছে লাতিন আমেরিকার অন্যত্র এবং ক্যারিবিয়ান অঞ্চল থেকে আমেরিকায় অভিবাসীদের সংখ্যা বৃদ্ধি। আমেরিকার আদম শুমারি দপ্তরের জনগণনা বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, যারা আমেরিকায় অভিবাসী হয়েছে এবং যারা আমেরিকা ছেড়ে চলে গেছে তাদের সংখ্যার সার্বিক হিসাব থেকে দেখা যাচ্ছে আমেরিকায় অভিবাসন গত এক দশকে এখন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।

এর আংশিক কারণ হলো অভিবাসনের সংখ্যা হ্রাস, কিন্তু অন্য কারণ হলো যারা আমেরিকার বাইরে জন্মেছেন, তারা বর্ধিত সংখ্যায় বিদেশে ফিরে যাচ্ছেন। এ তথ্য জানিয়েছেন আমেরিকার আদম শুমারি দপ্তরের অ্যান্টনি ন্যাপ।

এই ধারার আরেকটা অর্ন্তনিহিত কারণ হলো ভিসা পদ্ধতির কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব - সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

প্রতি বছর আমেরিকায় যত সংখ্যক শরণার্থীকে প্রবেশের অনুমতি দেয়া হয়, সেটা নির্ভর করে একটা কোটা পদ্ধতির ওপর। এই কোটার পরিসর নির্ধারণ করার চূড়ান্ত ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে। যারা শরণার্থী হিসাবে আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থী, তাদের এর জন্য আবেদন করতে হয় আমেরিকার বাইরের দেশ থেকে, এবং নিজের দেশে বাস করা তাদের জন্য কতটা বিপদের এবং স্বদেশে নির্যাতনের ঝুঁকি কতটা সে ব্যাপারে তাদের যুক্তি আমেরিকান কর্তৃপক্ষ কতটা গ্রহণ করছে, আবেদনের সাফল্য নির্ভর করে তার ওপর।

মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলো থেকে আমেরিকায় অভিবাসনের ব্যাপারে মি. ট্রাম্পের বৈরিতা সুবিদিত। এক সময় তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন “যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিমদের ঢোকা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবেন”। কাজেই শরণার্থীদের ঢোকার জন্য কোটা ব্যবস্থা মুসলিমদের অভিবাসন পুরো বন্ধ করার বদলে বিষয়টাকে সহজ করে দিয়েছে। যদিও এভাবে নেয়া সিদ্ধান্ত আইনি চ্যালেঞ্জের জটিলতায়ও জড়িয়ে পড়েছে।

এর ফলে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ, যেমন ইরাক, সোমালিয়া, ইরান এবং সিরিয়া থেকে আমেরিকায় আশ্রয়প্রার্থী শরণার্থীর সংখ্যা মি. ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পরপরই প্রায় শূণ্যের কোঠায় নেমে গেছে।

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব - সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

শুধু মাত্র ভিসা দেওয়া কঠিন করে বা শরণার্থীদের ঢোকা হ্রাস করে যে আমেরিকায় মানুষের অভিবাসন সংখ্যা কমানো হয়েছে তা নয়, মি. ট্রাম্প কোনরকম সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ছাড়া কারোর আমেরিকায় বাস করা বা দেশটিতে ঢোকা আরও কঠিন করেছেন।

কিন্তু এটা শুনতে সহজ মনে হলেও কাজে অনেক বেশি কঠিন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ক্ষমতাকালে কী ঘটেছে, তা বুঝতে হলে প্রথমে প্রত্যাবাসন বা কাউকে তার নিজের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করার সরকারি যে পরিসংখ্যান দেয়া হয়েছে, আমাদের সেটা পরিষ্কারভাবে বুঝতে হবে। এই পরিসংখ্যান দুটি বিভাগে ভাগ করা হয়েছে।

যাদের “অপসারণ” বলে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে তাদের দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছে আদালতের নির্দেশক্রমে। আর যাদের “প্রত্যাবর্তন” বলে শ্রেণীভুক্ত করা হয়েছে, তারা হলো যাদের সীমান্ত পার হয়ে ঢোকার চেষ্টার সময় ঢোকার অনুমতি দেয়া হয়নি। ফলে তাদের ফিরে যেতে হয়েছে বা তাদের ফিরে যেতে বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে আদালতের নির্দেশের কোন ব্যাপার নেই।

যারা “অপসারণ” শ্রেণীভুক্ত তাদের জন্য পরিস্থিতি কঠিন, কারণ এর দীর্ঘমেয়াদী আইনি পরিণতি আছে, অর্থাৎ এদের জন্য ভবিষ্যতে আমেরিকায় আবার ঢোকার চেষ্টা অনেক কঠিন হবে। তবে যাদের আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে আটকে দেয়া হয়েছে এবং সেখান থেকে যারা ফেরত গেছেন, তারা পরবর্তীতে আবার সীমান্ত পেরনোর চেষ্টা করেছেন। প্রেসিডেন্ট জর্জ ডাব্লিউ বুশ অভিবাসন প্রত্যাশীদের অপসারণের জন্য যে নীতি প্রণয়ন করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট ওবামা তার শাসনামলে তা আরও কঠোরভাবে প্রয়োগ করেছিলেন- বিশেষ করে যাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অপরাধের অভিযোগ আছে বা যারা ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন।

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব - সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অবশ্য তার পূর্বসূরীর সাথে তুলনা করলে, প্রত্যাবাসনের আওতায় এই দুই শ্রেণীভুক্ত লোকেদের সংখ্যায় বড়ধরনের কোন পরিবর্তন আনেননি।

আমেরিকার অভিবাসন, শুল্ক ও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো, যারা মূলত কাউকে তাদের নিজের দেশে ফিরে যেতে বাধ্য করার বিষয়টি দেখাশোনা করে, তারা বলছে আমেরিকা থেকে কাউকে “অপসারণের” বর্তমান হার “খুবই কম”। তারা বলছে এর কারণগুলোর মধ্যে রয়েছে অর্থসম্পদের অভাব এবং “আইন ও বিচার ব্যবস্থায় বিভিন্ন ধরনের প্রতিবন্ধকতা”।

এছাড়াও আমেরিকা-মেক্সিকো সীমান্তে অভিবাসন নিয়ে তারা অনেক চাপের মধ্যে রয়েছে। ট্রাম্প প্রশাসন আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য নীতিতে যেসব পরিবর্তন এনেছে তার ফলে বহু আবেদন জমা হয়ে রয়েছে। সেগুলো সমাধান করা এখনও সম্ভব হয়নি। এসব আবেদনের মধ্যে রয়েছে অনেক পরিবার যারা তাদের সন্তানদের থেকে আলাদা হয়ে আটক কেন্দ্রে দিন কাটাচ্ছে, যেখানে শিশুরা রয়েছে বাবামায়ের থেকে আলাদা আটক কেন্দ্রে। অনেক ক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থীদের মেক্সিকোতে ফেরত পাঠানো হয়েছে এবং বলা হয়েছে তাদের আবেদন যতদিন না পর্যালোচনা করা হচ্ছে তাদের মেক্সিকোতে অপেক্ষা করতে হবে।

সীমান্ত সংকট নিয়ে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক খবরাখবর প্রচার হওয়া সত্ত্বেও, ২০১৯ সালের প্রকাশিত তথ্যে দেখা যাচ্ছে, অভিবাসন প্রত্যাশীদের সীমান্ত পার হবার আকাঙ্ক্ষায় বাধা দেয়া হয়নি। বরং আগের বছরের তুলনায় সীমান্তে আটকে দেয়া মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। এই সংখ্যা বৃদ্ধির মূলে ছিল পরিবারের সদস্যদের বেশি সংখ্যায় সীমান্ত পেরিয়ে আমেরিকায় ঢোকার চেষ্টার কারণে।

আমেরিকা নির্বাচন ২০২০: ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিবাসন নীতির প্রভাব - সাতটি চার্টে ব্যাখ্যা

এর ফলে ২০১৯ সালে ”প্রত্যাবর্তন” বিভাগে পরিসংখ্যান অনেক বেশি বেড়ে যাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যে এই পরিসংখ্যান প্রকাশিত হবার কথা রয়েছে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিবাসন নীতির ব্যাপারে তার কঠোর মনোভাব তুলে ধরে তার সমর্থকদের কতটা উদ্দীপ্ত করতে পারবেন? ভোট নিয়ে জনমত জরিপ চালায় যেসব সংস্থা তাদের সাথে কথা বলেছেন যেসব মানুষ, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ক্ষমতায় আসার পর থেকে তাদের মধ্যে অভিবাসন আমেরিকার জন্য খারাপ এই মনোভাব ক্রমশ কমেছে বলে দেখা গেছে। যারা আগে অভিবাসন বিরোধী ছিলেন, তাদের অনেকেই এখন কার্যত বিশ্বাস করতে শুরু করেছেন যে অভিবাসন সাধারণভাবে দেশটির জন্য ভাল।

অভিবাসনের প্রতি জন সমর্থন এখন রেকর্ড মাত্রায় বেড়েছে এবং বাড়ছে

তবে ডেমোক্রাট এবং রিপাবলিকান ভোটারদের মধ্যে অভিবাসন নিয়ে এখও বিশাল মতভেদ রয়েছে। রিপাবলিকানরা এখনও ব্যাপকভাবে মনে করতে চান যে, অভিবাসন আমেরিকার জন্য ইতিবাচক প্রভাব আনতে পারে না এবং ফলে তারা আরও বেশি করে চাইবেন যে অভিবাসন কঠোর হাতেই দমন করা দরকার। কিন্তু তার পরেও জরিপে দুই দলের সমর্থকদের মধ্যেই অভিবাসনকে ইতিবাচকভাবে দেখার প্রবণতা বাড়তে দেখা গেছে।

মি. ট্রাম্প অবশ্যই আশা করছেন যে অভিবাসন নিয়ে তার কঠোর নীতি তার রিপাবলিকান সমর্থকদের কাছে এখনও জনপ্রিয় হবে এবং তার এই কঠোর অভিবাসন নীতির হাত ধরে তিনি নির্বাচনের বৈতরণী পার হতে পারবেন।

সূত্র:- বিবিসি বাংলাদেশ

Leave a Reply