চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কতদুর।

0
15

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কতদুর।

মোঃ সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম।

বাণিজ্যিক রাজধানী খ্যাত চট্টগ্রাম মহানগরের প্রধান সমস্যা জলাবদ্ধতা। দীর্ঘ বছরের এ সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পর পর চারটি মেগাপ্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন একনেক বৈঠকে। এসব প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় প্রায় ১১ হাজার কোটি টাকা। গত জুন মাসে তিনটি প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হলেও কাজ শেষ হয়নি। প্রকল্পগুলোর মধ্যে একটির আনুমানিক ১০ শতাংশ, আরেকটির ৩৭ শতাংশ, অন্যটির ৩৮ শতাংশ কাজ হয়েছে। আর প্রায় দেড় বছর আগে একনেকে অনুমোদন পাওয়া চতুর্থ প্রকল্পটির মূল কাজ এখনো শুরুই হয়নি। আগামী অক্টোবরে শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।

 

চট্টগ্রাম মহানগরে জলাবদ্ধতা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে তা নিরসনে এ চারটি মেগাপ্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল। চার বছর আগে তিনটি প্রকল্প একনেকে অনুমোদন দেওয়া হয়। এই সময়ে প্রতিবার বর্ষায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে প্রকল্প গ্রহণ-বাস্তবায়ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে একই কথা বলা হয়, এবার নয়, আগামী বর্ষায় আর জলাবদ্ধতা থাকবে না। চলতি বর্ষায়ও নগরের প্রধান প্রধান সড়ক, উপসড়ক, অলিগলিসহ অনেক এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু জলাবদ্ধতা নিরসনে এসব প্রকল্পের কাজ কবে নাগাদ শেষ হবে, তা নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো।
প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের অভিন্ন বক্তব্য, ‘প্রকল্পগুলোর কাজ একসঙ্গে শেষ না হলে জলাবদ্ধতা থেকে চট্টগ্রামবাসীর মুক্তি নেই। আর প্রকল্প শেষ হওয়া নির্ভর করছে সরকার থেকে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার ওপর। চাহিদা অনুসারে অর্থ বরাদ্দ পাওয়া না গেলে প্রকল্পের কাজ বর্ধিত সময়েও বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কতদুর।চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি কতদুর।

চট্টগ্রাম মহানগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে চারটি মেগাপ্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। জলাবদ্ধতা নিরসনে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়নে পাঁচ হাজার ৬১৬ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকার তিন বছরমেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদ গত মাসে শেষ হয়েছে। অথচ এই পর্যন্ত প্রকল্পটির অগ্রগতি ৩৮ শতাংশ। তবে প্রকল্পটির পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী আহমদ মাঈনুদ্দিন বলেন, ‘এ পর্যন্ত প্রকল্পের কাজ ৫০ শতাংশ শেষ হয়েছে। গত মাসে মেয়াদ শেষ হলেও মেয়াদ আরো এক বছর বাড়াতে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘ঢাকায় যেভাবে জলাবদ্ধতা হয়েছে, চট্টগ্রামে এবার সেভাবে হয়নি। চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতার প্রধান কারণ, জোয়ারের পানি নদী থেকে শহরে প্রবেশ করে। জলাবদ্ধতা থেকে রেহাই পেতে প্রকল্পগুলোর কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এ প্রকল্পে প্রায় পাঁচ হাজার ৭০০ কোটি টাকার মধ্যে এ পর্যন্ত সরকার থেকে পাওয়া গেছে এক হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে আরো দুই হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে। বরাদ্দ হয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। প্রয়োজনীয় অর্থ ছাড় পাওয়া গেলে আশা করছি আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ করা যাবে।’

দুই হাজার ৩১০ কোটি টাকা ব্যয়ে কর্ণফুলী নদীর তীর কালুরঘাট সেতু থেকে চাক্তাই খাল পর্যন্ত সাড়ে আট কিলোমিটার সড়ক নির্মাণের আরেকটি প্রকল্পও বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। তিন বছরমেয়াদি এ প্রকল্পের মেয়াদও গত মাসে শেষ হলে আরো এক বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। তবে গত জুন পর্যন্ত প্রকল্পের অগ্রগতি ৩৭ শতাংশ।

এ প্রকল্পের পরিচালক ও সিডিএর আরেকজন নির্বাহী প্রকৌশলী রাজীব দাশ বলেন, ‘জলাবদ্ধতা নিরসনে চট্টগ্রামের চারটি প্রকল্পের অধীন ৪০টি স্লুইস গেট নির্মাণকাজ শেষ হলে জোয়ারের পানি আর নগরে প্রবেশ করবে না। আমাদের এ প্রকল্পের আওতায় ১২টি স্লুইস গেটের মধ্যে আটটির কাজ চলমান রয়েছে। অন্য চারটির কাজ চলতি বর্ষার পর শুরু হবে। সব মিলে প্রকল্পের ৪০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।’ ২০১৪ সালে চট্টগ্রাম মহানগরে নতুন করে একটি খাল খনন (বারইপাড়া থেকে কর্ণফুলী নদী পর্যন্ত ২ দশমিক ৯ কিলোমিটার দীর্ঘ, ৬৫ ফুট প্রস্থ) প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হয়। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনকে দেওয়া এ প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয় ৩৫৭ কোটি টাকা। অর্থাভাবে ওই প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি। পরে ২০১৮ সালে এ প্রকল্পের (সংশোধিত) ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় এক হাজার ২৫৬ কোটি টাকা। একনেকে অনুমোদন হওয়া এ প্রকল্পের মেয়াদ ছিল গত জুন পর্যন্ত। কিন্তু অর্থাভাবে এখনো ভূমি অধিগ্রহণ শেষ হয়নি। প্রকল্পের কাজও পুরোপুরি শুরু করা যায়নি।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন বলেন, ‘এ প্রকল্পে ভূমি অধিগ্রহণের জন্য এক হাজার ১২০ কোটি টাকা প্রয়োজন। আমরা সরকার থেকে এরই মধ্যে ৯০০ কোটি টাকা পেয়েছি। সেই টাকা জেলা প্রশাসনকে দেওয়া হয়েছে। পুরো টাকা দিতে না পারায় এখনো ভূমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ হয়নি। আশা করছি বর্ষার পর কাজ শুরু করতে পারব। প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো হয়েছে।’

আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। গত বছর ফেব্রুয়ারিতে এক হাজার ৬২০ কোটি ৭৩ লাখ টাকা ব্যয়ে এ প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন পায়। চট্টগ্রাম মহানগরের বন্যা নিয়ন্ত্রণ জলাবদ্ধতা নিষ্কাশন উন্নয়ন নামের এ প্রকল্পের মেয়াদ ২০২২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে এখনো এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়নি।

পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের নির্বাহী প্রকৌশলী ত্রয়ন ত্রিপুরা বলেন, ‘এ প্রকল্প বাস্তবায়নে সহযোগিতা করবে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এরই মধ্যে আনুষঙ্গিক কাজ শেষ হয়েছে। আগামী অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ থেকে পুরোদমে কাজ শুরু হবে। চলতি অর্থবছরে ৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেলেও এখনো অর্থ ছাড় হয়নি। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদেই কাজ শেষ করা হবে।

Leave a Reply