একটা মেয়ের জীবনের কঠিন সত্য।

0
54

মিলন মাহমুদ, গুরুদাসপুর (নাটোর) প্রতিনিধি:-

দুদিন পর আমার বিয়ে,
মেহমান আসতে শুরু করছে বাড়ি গমগম করছে বিয়ের কুটুমে।দাদিরা আমায় নিয়ে রসিকতা করছে, ভাবিরাও কত তামাশা করছে আমিও হাসছি।

অনেক রাত হল সবাই ঘুমুচ্ছে
গোটা বিয়ে বাড়িটা গভীর ঘুমে নিমগ্ন। কিন্তু আমার চোখে ঘুম নেই।রাত পোহালেই আমার গায়ে হলুদ।বাবার বাড়ির অধিকার নিয়ে আর মাত্র একটা দিন আছি।এর পরদিনই চলে যাবো অন্য একটা অপরিচিত মানুষের ঘরে।

তাদের আপন করে নিতে হবে,
কিন্তু যারা আমার আপনজন তাদের আমি প্রতিদিন দেকতেই পাবো না।এমন কি যে মা আমায় জন্ম দিল তাকেও না।আমার রক্তের সম্পর্ক, আমার আপনজন।
ভুলে অন্য কাওকে আপন করতে হবে।এটাই আমার নিয়তি,সবার সাথে দেখা হবে হয়তো।

কিন্তু আমি তখন অন্য বাড়ির বৌ,নিজের বাড়িতে আমি আসবো অতিথি হয়ে খুব মনে পরছে আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানোর রাতগুলো… আব্বুর সাথে করা বায়নাগুলো ছোটভাই দুটোর সাথে ঝগড়া খুনশুটির সময় গুলো।

ওদের সাথে আর ঝগড়া হবে না
সকালে ঘুম থেকে দেরি করে উঠি বলে আম্মুআর বকবে না।
আমার ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে,
আচ্ছা আমি যে চলে যাবো তাই মনে করে কেউ
কি কাঁদছে।জানি হয়তো আম্মুর চোখেও ঘুম নেই খুব ইচ্ছে করছে আম্মুকে গিয়ে বলতে “আম্মু আমি আর কয়েকটা দিন তোমায় জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে চাই এইভাবে পর করে দিওনা আমায় কিন্তু পারছি না।

তা আর সম্ভবও না,
ঘড়ির কাঁটার প্রতিটা সেকেন্ড পার হচ্ছে আর আমার এ বাড়িতে থাকার সময়টা ফুরিয়ে আসছে এসব ভাবতে ভাবতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম জানি না।ভোরের আলোয় ঘুম ভাঙলো
সারা বাড়ি মুখোরিত অথিতিদের কলরবে।
সবার কত কাজ আমার বান্ধবি, ভাবি সবাই আমাকে নিয়ে ব্যাস্ত।
আমাকে কিভাবে সাজাবে,কিভাবে সুন্দর লাগবে আর ও কত কি।আমি ওদের দিকে ব্যাধিগ্রস্ত হরিণীর মতো
তাকিয়ে আছি মনে মনে ভাবছি তোরা আমাকেসাজিয়ে গুছিয়ে এইভাবে পর করে দিচ্ছিস।

আর কয়েকটা দিন থাকতে দেনা প্লিজ আমার যে খুব কষ্ট হচ্ছে।
নানা আয়োজনের পর আমাকে বিকেলে সবাই গায়ে হলুদের জন্য নিয়ে যাচ্ছে মা’কে আগেই বলে রেখেছিলাম আমার গায়ে হলুদটা যেন আমার আম্মু ছোঁয়ায়।আম্মু আমার গায়ে হলুদ ছোঁয়াচ্ছে আর আমার
প্রত্তেকটা ইন্দ্রিয় যেনো বলছে দাও মা তোমার ঘরে থাকাকালীন শেষ গোসলটা করিয়ে দাও একদিন এইভাবেই জীবনের প্রথম গোসলটা তুমিই করাইছিলা আজ এইভাবেই পর করে দাও।

হলুদের পর্ব শেষে সবাই আমাকে সাজিয়ে দিলো। রোশনাই এর আলোয় সারা বাড়ি সেজে উঠলো।
সবাই আমাকে ঘিরে বসেছে একজন মেহেদী পড়িয়ে দিচ্ছে
আগে কত স্বপ্ন দেখতাম এই বিষয়গুলো নিয়ে।

কিন্তু আজ বিষন্নতা আমায় ঘিরে ধরেছে ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে আর বলতে আমাকে পর করে দিওনা।সবাই যখন চলে গেলো চুপি চুপি আম্মুর কাছেগিয়ে বসলাম আম্মুকে বল্লাম,
আম্মু আমার খুব ক্ষিদে পেয়েছে আমাকেআজ তুমি খাইয়ে দিবে
কেনো দেবো না।

তুই বস্ আমি খাবার নিয়ে আসছি।আম্মু আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে আর আমি ছলছল
চোখে আম্মুর দিকে তাকাচ্ছি আর ভাবছি”মা গো তোমার ছোট্ট মেয়েটা কত্ত বড় হয়ে গেছে, কাল তার বিয়ে না চাইতেই চোখ থেকে জল পড়ছে।

হঠাৎ আম্মু আমাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কেঁদে দিল।
আমি আর নিজেকে আটকাতে পারলাম না।আম্মুকে জড়িয়ে অনেকক্ষণ কাঁদলাম আজ আবার আম্মুকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে গেলাম।

আর হয়তো এ সুযোগ পাবো না
আম্মু আমাকে ঘুম পাড়িয়ে চলে গেলো কিন্তু আমি তো ঘুমাই নি,
ঘড়ির কাঁটা টা এক ঘর করে পথ অতিক্রম করছে আর আমার সময় ফুরাচ্ছে।

দেখতে দেখতে রাতটাও কেটে গেল।আজ আমার বিয়ে,
আমাকে সাজানো হয়ে গেলো
সবাই আমাকে নিয়ে তামাশা করছে।হঠাৎ কে যেনো এসে বল্ল বর এসেছে আমার ভেতরটা যেন কেমন করে উঠল।
সবাই ছুটে গেল বর দেখতে।
আমি একলা ভাবছি “আর মাত্র কিছুটা সময় আমার এ বাড়িতে থাকা সব অধিকার চুকে যাচ্ছে।
সারা বাড়িতে অথিতি আপ্পায়নের আমেজ শুরু
হয়েছে।কিছুক্ষণ পর কাজী সাহেব একটা খাতা নিয়ে আমাকে সাইন করতে বল্লেন।

কলমটা হাতে নিয়ে ভাবছি আজ থেকে আমিও আমার না আমার সব ইচ্ছে আশা আকাঙ্খা সব অন্যের নামে দলিল করে দিচ্ছি এটাই আমার নিয়তি।
আম্মু বিদায় চিরো কালের জন্য বিদায়।সকল বোনদের প্রতি রইল ভালোবাসা।

Leave a Reply