চট্টগ্রামে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে সাফল্য আসছে।

0
23
চট্টগ্রামে বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে সাফল্য আসছে।
মোঃ সিরাজুল মনির ব‍্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম।

শিক্ষক মোজাম্মেল হক শুরুতে ঘরের ভেতরে ৩০০ লিটারের একটি ছোট ট্যাংকে কই ও তেলাপিয়া মাছ চাষ শুরু করেন তিনি। ইউটিউব দেখে দেখে নিজেই তৈরি করেছিলেন সেই বায়োফ্লক প্রজেক্ট। প্রথম চালানেই ৬০ হাজার টাকার মাছ বিক্রি হয় তার। পরে ভারত থেকে অভিনব এই পদ্ধতির মাছচাষের ওপর প্রশিক্ষণও নিয়ে আসেন। বাড়িয়ে নেন আরও জায়গা, আরও ট্যাংক। এরপর তার সাফল্য হয়ে ওঠে অন্যদের কাছে দৃষ্টান্ত। তিনি চট্টগ্রামের টাইগারপাস বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোজাম্মেল হক।

বায়োফ্লক পদ্ধতির সাফল্যে এভাবে মাছ চাষে আগ্রহী হয়ে উঠছেন চট্টগ্রামের অনেকেই। বাড়ির ছাদে কিংবা আঙ্গিনায় পানির ট্যাংকের মধ্যেই এই পদ্ধতি মাছ চাষ করা হয়। মাছ চাষের এটি এমন একটি পদ্ধতি— যেখানে বিশেষ ব্যবস্থায় অল্প জায়গায় বিপুল পরিমাণ মাছ চাষ করা যায়। একটি পুকুরের সমপরিমাণ জায়গায় বায়োফ্লকে মাছ চাষ করা যায় ২০ গুণ বেশি। পোনা ছেড়ে বাজারজাত করা পর্যন্ত সময় লাগে সাড়ে ৩ থেকে ৪ মাস।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে ১০ হাজার লিটারের একটি পানির ট্যাংকে বছরে ৫ টন মাছ উৎপাদন করা যায়। মাছের খাবারও লাগে খুবই কম। এছাড়া মাছের রোগব্যাধিও অনেকটাই কম। মাছ চাষে মূলত ৬০ ভাগ খরচই খাবারের জন্য ব্যয় হয়। কিন্তু বায়োফ্লক পদ্ধতিতে সিস্টেমের উপকারী ব্যাকটেরিয়া ট্যাংকেই অণুজীব প্রোটিন তৈরি করে। তাই এ পদ্ধতিতে অন্যান্য সিস্টেমের চেয়ে অনেক কম খাবার লাগে। তাতে চাষের খরচ কমে যায় এবং লাভও হয় বেশি।

প্রচলিত পদ্ধতিতে মাছ চাষের চেয়ে এই পদ্ধতিটি সম্পূর্ণ আলাদা হওয়ায় সরকারের মৎস্য গবেষণা ইন্সটিটিউট এটি নিয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ক্যাটফিশজাতীয় মাছ শিং মাগুর পাবদা চাষে এই পদ্ধতি সফল। এছাড়া কৈ মাছ, তেলাপিয়া ও নাইলোটিকার চাষ হচ্ছে এ পদ্ধতি ব্যবহার করে।

জানা গেছে, এই পদ্ধতিতে ভেনামি চিংড়ি চাষে ভারতে বেশ সফলতা এসেছে। অনেক চাষী এই পদ্ধতি ব্যবহার করে চিংড়ির মতো দামি মাছ উৎপাদন করতেও আগ্রহী।

চট্টগ্রামের উত্তর হালিশহর ব্যবসায়ী আবদুল আজিজ ভারত থেকে বায়োফ্লকের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে এসেছেন। তিনি ২০১৭ সালে একটি ট্যাংক দিয়ে ঘরের আঙ্গিনায় শুরু করেন বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ। এখন তার ঘরে পাঁচটি ট্যাংকে হচ্ছে বায়োফ্লক পদ্ধতির মাছ চাষ।

তিনি বলেন, মাছ চাষের এই পদ্ধতিতে নতুন চাষীরা আগ্রহ দেখাচ্ছেন। আগামীতে এটিই ঘরে ঘরে চালু হবে।

বায়োফ্লক কী?

বায়ো শব্দটি গ্রিক ‘বায়োস’ থেকে এসেছে— যার অর্থ জীবন। আর ফ্লক মানে আলতোভাবে লেগে থাকা কণার সমষ্টি। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে জৈব বর্জ্যের পুষ্টি থেকে পুনঃব্যবহারযোগ্য খাবার তৈরি করা হয়। তাই স্বাভাবিকভাবেই বায়োফ্লক প্রযুক্তি মাছ চাষের একটি টেকসই এবং পরিবেশগত ভাবে বন্ধুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। এই পদ্ধতিতে চৌবাচ্চার পানিতে ব্যাকটেরিয়া, অণুজীব ও শৈবালের সমম্বয়ে পাতলা একটি আস্তরণ তৈরি হয়। যা পানিকে ফিল্টার করে। পানি থেকে নাইট্রোজেন জাতীয় ক্ষতিকর উপাদানগুলো শোষণ করে নেয় এবং এর প্রোটিনসমৃদ্ধ যে উপাদানগুলো থাকে সেগুলো মাছ খাবার হিসেবে গ্রহণ করতে পারে।

বায়োফ্লকের ম্যাজিকটা কোথায়?

চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকোয়াকালচার বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. রিজোয়ানুর রহমান বলেন, বায়োফ্লক পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় অনেক পরিমাণ মাছ চাষ করা যায়। পানির মধ্যে ব্যাকটেরিয়া তৈরি করে আবার সেটাকে মাছের খাবারকে রিসাইকেল করা হয়।

তিনি আরও বলেন, এখানে অক্সিজেনের একটি বড় ভূমিকা আছে। সবসময় অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক থাকতে হবে। বাতাসের মাধ্যমে পানিতে বুদবুদ চালু রাখতে হবে বায়োফ্লকে ২৪ ঘন্টা অক্সিজেন থাকার জন্য। একই সাথে পানিতে নাইট্রোজেন আর কার্বনের ভারসাম্য ঠিকমতো থাকতে হবে। পানির পিএইচ-এর মাত্রা ৬ থেকে ৮.৫ এর মধ্যেই থাকতে হবে। এ পদ্ধতির মাছ চাষের অবকাঠামোতে সার্বক্ষণিক বিদ্যুতের প্রয়োজন হবে।

বায়োফ্লকে মাছের ট্যাংক যেমন হয়ঃ

ট্যাংক তৈরি করা যায় ত্রিপল আর কংক্রিট দিয়ে। ত্রিপল ট্যাংকগুলো রেডিমেইড পাওয়া যায়। দাম পড়ে ৯ থেকে ১২ হাজার টাকার মধ্যে। এটিতে হারভেস্টের জন্য আলাদা পাইপ লাগিয়ে নিতে হয়। ত্রিপল বসানোর জায়গাটি বিশেষভাবে তৈরি করে নিতে হয়। চারদিকে লোহার রড দিয়ে খাঁচা বানিয়ে বসাতে হয় ত্রিপল। ১০ হাজার লিটারের ট্যাংক ত্রিপল বাজারে পাওয়া যায়।

অন্যদিকে কংক্রিটের ট্যাংক মিস্ত্রি দিয়ে তৈরি করে নিতে হয়। এখানেও প্রয়োজনে ট্যাংক থেকে পানি ছেড়ে দেওয়ার বা হারভেস্ট করার পদ্ধতিটা রাখতে হয়। গোলাকার বা চতুর্ভূজ আকারে ট্যাংক তৈরি করা যায়। এতে পানির উচ্চতা থাকবে তিন ফুট এবং ট্যাংকের ভিতরে উচ্চতা হবে সাড়ে তিন ফুট।

পানির তাপমাত্রা রাখতে হবে ২৪-৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে। আর পানির রং হবে সবুজ, হালকা সবুজ বা বাদামি। এর দ্রবীভূত অক্সিজেন, পিএইচ, ক্ষারত্ব, খরতা, ক্যালসিয়াম, অ্যামোনিয়া, নাইট্রেইট, ফসফরাস, আয়রন, পানির স্বচ্ছতা, গভীরতা, লবণাক্ততা— এগুলোসহ সবকিছুর সুনির্দিষ্ট পরিমাণ মেনে ব্যবস্থা নিতে হয়।

এরপর পানিতে দরকারি সব উপাদান ঠিকমতো দিয়ে ‘ফ্লক’ তৈরি করতে হয়। এজন্য দরকার হয় সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সরবরাহ ব্যবস্থা। ঠিকমতো ‘ফ্লক’ তৈরি হলে পানির রং হবে সবুজ বা বাদামি। আর পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখা যাবে। এভাবে ২১ দিন ধরে প্রস্তুত হওয়া পানিতেই ছাড়তে হবে মাছের পোনা।

বায়োফ্লক মাছের রোগব্যাধি নিয়ে ৪ বছর ধরে কাজ করছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রি নেওয়া মোহাম্মদ নুর হোসাইন। তিনি বলেন, বায়োফ্লক পদ্ধতির মাছ চাষে তিন ধরনের রোগ দেখা যায়। যেমন ব্যাকটেরিয়াল রোগ, ফাংশনাল রোগ ও উকুনজনিত রোগ। এসব রোগ চিকিৎসা দিয়েই সারানো সম্ভব। এখানে প্রতি মুহুর্তে ট্যাংকের ভেতরের পানিতে নানা পরিবর্তন হয়, যেগুলো মনিটরিং করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হয়। বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষে সফলতা আসে পানির মাত্রা ঠিক রাখার ওপর।

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষ করবেন যেভাবে
বায়োফ্লকে মাছ চাষের জন্য পানি ব্যবস্থাপনা ও ফ্লক একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যেকোনো মাছ বা চিংড়ি চাষ বা বায়োফ্লক প্রজেক্ট করার আগে পানির উৎস কী হবে এবং তার গুণাগুণ বা ব্যবহারের উপযোগিতা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হবে।

পানির উৎস: গভীর নলকূপ, সমুদ্র, নদী, বড় জলাশয়, লেক, বৃষ্টি ইত্যাদির পানির গুণ ও মান ভালো থাকলে ব্যবহার করা যায়।

পানি তৈরি: প্রথমে ট্যাংক ব্লিচিং পাউডার দিয়ে জীবাণুমুক্ত করে নিতে হবে। এরপর নির্বাচিত পানির গুণাগুণ পরীক্ষা করে পানি দিতে হবে।

মাছ চাষে পানির গুণাবলীঃ

বায়োফ্লক পদ্ধতিতে মাছ চাষের জন্য পানির কিছু গুণাবলী দরকার। এগুলো হচ্ছে—
১. তাপমাত্রা ২৫ থেকে ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস
২. পানির রং হবে সবুজ, হালকা সবুজ, বাদামি
৩. দ্রবীভূত অক্সিজেন ৭-৮ মিলিগ্রাম বা লিটার
৪. পিএইচ ৭.৫-৮.৫
৫. ক্ষারত্ব ৫০-১২০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৬. খরতা ৬০-১৫০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৭. ক্যালসিয়াম ৪-১৬০ মিলিগ্রাম বা লিটার
৮. অ্যামোনিয়া ০.০১ মিলিগ্রাম বা লিটার
৯. নাইট্রাইট ০.১-০.২ মিলিগ্রাম বা লিটার
১০. নাইট্রেট ০-৩ মিলিগ্রাম বা লিটার
১১. ফসফরাস ০.১-৩ মিলিগ্রাম বা লিটার
১২. এইচটুএস ০.০১ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৩. আয়রন ০.১-০.২ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৪. পানির স্বচ্ছতা ২৫-৩৫ সেন্টিমিটার
১৫. পানির গভীরতা ৩-৪ ফুট
১৬. ফলকের ঘনত্ব ৩০০ গ্রাম বা টন
১৭. টিডিএস ১৪,০০০-১৮,০০০ মিলিগ্রাম বা লিটার
১৮. লবণাক্ততা ৩-৫ পিপিটি।

পানিতে যেভাবে ফ্লক তৈরি করতে হবেঃ

প্রথম ডোজে ৫ পিপিএম প্রোবায়োটিক, ৫০ পিপিএম চিটাগুড়, ৫ পিপিএম ইস্ট, পানি প্রতি টনের জন্য ১ লিটার, একটি প্লাস্টিকের বালতিতে অক্সিজেন সরবরাহ করে ৮-১০ ঘণ্টা কালচার করে প্রয়োগ করতে হবে। ২য় দিন থেকে ১ পিপিএম প্রোবায়োটিক, ৫ পিপিএম চিটাগুড়, ১ পিপিএম ইস্ট, প্রতি টনের জন্য ১ লিটার পানি দিয়ে উপরের সময় ও নিয়মে কালচার করে প্রতিদিন প্রয়োগ করতে হবে।

কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ
পানিতে যথাযথ পরিমাণ ফ্লক তৈরি হলে-
১. পানির রং সবুজ বা বাদামি দেখায়
২. পানিতে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র কণা দেখা যায়
৩. পরীক্ষা করলে পানি অ্যামোনিয়া মুক্ত দেখায়
৪. প্রতি লিটার পানিতে ০.৩ গ্রাম ফ্লকের ঘনত্ব পাওয়া যাবে
৫. ক্ষুদিপানা দেওয়ার পর তাদের বংশ বিস্তার পরিলক্ষিত হয়।

ট্যাংক তৈরিঃ

প্রথমে গ্রেড রড দিয়ে ট্যাংকের বৃত্তাকার খাঁচাটি তৈরি করতে হবে। যে স্থানে ট্যাংকটি স্থাপন করা হবে, সেখানে খাঁচার পরিধির সমান করে সিসি ঢালাই দিতে হবে। বৃত্তের ঠিক কেন্দ্রে পানির একটি আউটলেট পাইপ স্থাপন করতে হবে। এরপর খাঁচাটিকে ঢালাই মেঝের উপর স্থাপন করে মাটিতে গেঁথে দিতে হবে। মেঝের মাটি শক্ত ও সমান হলে ঢালাইয়ের পরিবর্তে পরিধির সমান করে পুরু পলিথিন বিছিয়েও মেঝে প্রস্তুত করা যায়। এরপর উন্নতমানের তারপুলিন দিয়ে সম্পূর্ণ খাঁচাটি ঢেকে দিতে হবে। তার ওপর পুরু পলিথিন দিয়ে আচ্ছাদিত করে তাতে পানি মজুদ করতে হবে।

এরেটর পাম্প: বায়োফ্লক ট্যাংকে সার্বক্ষণিক অক্সিজেন সাপ্লাই দেওয়ার জন্য একটি এরেটর পাম্প স্থাপন করতে হবে। ৬ ফুট ব্যাসার্ধের এবং ৪ ফুট উচ্চতার একটি ট্যাংকে প্রায় ৩০ হাজার শিং মাছ চাষ করা যাবে।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিভাগের প্রফেসর মনজুরুল কিবরিয়া বলেন যাদের বড় পুকুরে মাছ চাষ করার সুযোগ নেই তারা এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ রয়েছে। যদি এ পদ্ধতি খুব সৌখিন তারপরও যদি বৈজ্ঞানিক উপায়ে এর রক্ষণাবেক্ষন সঠিকভাবে করা যায় তাহলে চাষী অধিক সাফল্য পাবে।

Leave a Reply