দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। উদ্ধারে কাজ করছে মৎস্য অধিদপ্তর।

দেশি প্রজাতির মাছ বিলুপ্তপ্রায়। উদ্ধারে কাজ করছে মৎস্য অধিদপ্তর।
মোঃ সিরাজুল মনির ব‍্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম।

এক সময় খাল-বিল, নদী-নালায় পাওয়া যেত বিপুল প্রজাতির দেশি মাছ। প্রাকৃতিক জলাশয় কমে যাওয়া, খাল-বিল ভরাট, কৃষি ও কল-কারখানায় রাসায়নিক পদার্থের মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহারে পানি দূষণ বৃদ্ধিসহ নানা কারণে এসব মাছ হারাতে বসেছে। আশার কথা হচ্ছে- বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীদের অব্যাহত গবেষণার ফসল হিসেবে বিলুপ্ত প্রায় এ মাছগুলো আবারও ফিরেছে খাদ্য তালিকায়।

মৎস্য খাতের অর্জন ও সমাজ উন্নয়নে অবদান: দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর পুষ্টি চাহিদা পূরণ, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন ও রপ্তানি আয়ে মৎস্য খাতের অবদান অনস্বীকার্য। প্রাণিজ আমিষের ৫৮ শতাংশ আসে মাছ থেকে। মাছে বিভিন্ন ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, আয়োডিন, ফসফরাস, লৌহসহ অন্যান্য খনিজপদার্থ থাকায় মানবদেহে অন্ধ্যত্ব, রক্তশূন্যতা, গলগ-সহ বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধে কার্যকর ভূমিকা পালন করে। দেশের ১৪ লাখ নারীসহ প্রায় ২ কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মৎস্য খাতের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করছে। মৎস্য খাতে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৬ লক্ষাধিক লোকের নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। তাই তো দেশ আজ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ। বাংলাদেশ থেকে ৫৮টি দেশে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি হচ্ছে। দেশ মাছ উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ হওয়ায় গ্রামের সাধারণ মানুষ এখন স্বল্প মূল্যে মাছ ও পুষ্টি পাচ্ছে। খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) তথ্যনুযায়ী, অভ্যন্তরীণ মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়, মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে চতুর্থ এবং বদ্ধ জলাশয়ে চাষকৃত মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে।

বিলুপ্ত প্রজাতি পুনরুদ্ধার : ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন) এর তথ্যমতে, মিঠাপানির ২৬০ প্রজাতির মাছের মধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায়। মিঠা পানির ২৬০ প্রজাতির মধ্যে ১৪৩ প্রজাতি হচ্ছে ছোট মাছ। মৎস্য উৎপাদনে ৩০ থেকে ৩৫ শতাংশ চাহিদা পূরণ হচ্ছে ছোট মাছ দ্বারা। মৎস্য অধিদফতরের সূত্রমতে, দেশের মোট জিডিপিতে মৎস্য খাতের অবদান ৩ দশমিক ৬১ শতাংশ।

মিঠাপানির বিপন্ন প্রজাতির মাছের জীন সংরক্ষণ ও চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবনে যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতিমধ্যে বিলুপ্তপ্রায় ২৩ প্রজাতির মাছের প্রজনন এবং চাষাবাদ কৌশল উদ্ভাবন করতে সক্ষম হয়েছে। এরমধ্যে পাবদা, গুলশা, গুজি আইড়, রাজপুঁটি, চিতল, মেনি, টেংরা, ফলি, বালাচাটা, শিং, মহাশোল, গুতুম, মাগুর, বৈড়ালী, কুঁচিয়া, ভাগনা, খলিশা, কালিবাউশ, কই, বাটা, গজার, সরপুঁটি, গণিয়া এ ২৩ প্রজাতির মাছের অস্তিত্ব ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আগামীতে মাছগুলোর জাত উন্নয়নে এবং আরও কয়েক প্রজাতির বিলুপ্তপ্রায় মাছ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে কাজ করছেন বিজ্ঞানীরা।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. সেলিনা ইয়াসমিন ফোনে জানান, উন্মুক্ত জলাশয় থেকে যে মাছগুলো বিলুপ্ত হতে চলেছে, সেগুলো সংরক্ষণ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে পুকুরে কিংবা আবদ্ধ জলাশয়ে বাণিজ্যিকভাবে মাছ চাষ করাই মূল উদ্দেশ্য। অভয়াশ্রম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এসব বিপন্ন প্রজাতির মাছ সুরক্ষায় মৎস্য অধিদফতরও কাজ করছে। ফলে বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছের প্রাপ্যতা সাম্প্রতিককালে বাজারে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং ক্রয়মূল্যও সাধারণ ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে আছে। বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় মাছ ঢেলা, শৈল বাইম, রানী, কাজলি, বাতাসি, কাকিলা, কাওন এবং ভোলমাছের প্রজনন ও চাষাবাদ পদ্ধতি নিয়ে গবেষণা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।

মাছ উৎপাদনের সার্বিক চিত্রঃ

দেশে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে ৯২৬টি হ্যাচারি রয়েছে যেখানে মাছ ও চিংড়ির রেণু পোনা উৎপাদন করা হয়। এর মধ্যে সরকারি হ্যাচারি ১০২টি এবং বেসরকারি হ্যাচারি ৮২৪টি। সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে বছরে মোট রেণু পোনা উৎপাদনের পরিমাণ ৬ লাখ ৮৬ হাজার ৭৫৪ কেজি। এর মধ্যে বেসরকারি হ্যাচারি উৎপাদন করে ৬ লাখ ৭৪ হাজার ৬৯৫ কেজি এবং সরকারি হ্যাচারি উৎপাদন করছে মাত্র ১২ হাজার ৫৯ কেজি রেণু পোনা। এর মধ্যে শুধু ময়মনসিংহ অঞ্চলে ২ থেকে আড়াইশ কোটি পাবদা ও গুলশা মাছের পোনা উৎপাদিত হচ্ছে। বর্তমানে মাঠ পর্যায়ে পাবদা, গুলশা, শিং, টেংরা, মাগুর, কই ব্যাপকভাবে চাষ হচ্ছে। বাটা মাছের চাষও বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশে মোট উৎপাদনের শতকরা মাত্র ১৬ ভাগ (৬ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন) সামুদ্রিক মাছের অবদান। বাকি ৩৭ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন অর্থাৎ ৮৪ শতাংশই মিঠা পানির মাছের অবদান। ২০১৮-১৯ অর্থ বছর শেষে দেশে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৪৩ লাখ ৮৪ হাজার মেট্রিক টন।

চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার মৎস্য চাষী আব্দুল কাইয়ুম এবং রাউজান এর হালিম বলেন, তারা বেশ কয়েকবছর ধরে দেশি মাছ চাষ করে আসছেন। বাজারে চাহিদা থাকায় এবং বাজারমূল্য ভালো থাকায় স্বল্প পুঁজিতে লাভ হয়। তাদের অনুস্মরণ করে আরও অনেকেই এসব দেশীয় মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছে। ময়মনসিংহ সদরের মৎস্য খামারি আবু রায়হান বলেন, নিবিড় পদ্ধতিতে শিং মাছ চাষ করে ৩২ শতাংশের একটি পুকুর থেকে ৯ হাজার কেজি মাছ বিক্রি করেছেন। তা থেকে পাঁচ মাসে তার লাভ হয়েছে ১১ লাখ টাকা।

নেপথ্যে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটঃ

আশ্চর্য্যজনক হলেও সত্য, যে ছোটমাছগুলো বিলুুপ্ত হতে চলেছিল সেই মাছগুলো নিয়ে গবেষণা কাজে সাফল্য আসায় গত এক দশকে দেশীয় ছোট মাছের উৎপাদন বেড়েছে ২৫৮ শতাংশ। ২০০৯ সালে পুকুরে দেশীয় মাছের মোট উৎপাদন ছিল মাত্র ৬৭ হাজার ৩৪০ মেট্রিক টন। আর ২০১৯ সালে এ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়ে ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়। একইভাবে ২০০৯ সালে মাত্র ২০ থেকে ২৫টি হ্যাচারীতে দেশীয় ছোট মাছের রেণু পোনা উৎপাদন করা হতো। অথচ বর্তমানে এ ধরনের হ্যাচারির সংখ্যা নয় শতাধিক।

মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কাজী শামস আফোজ ফোনে বলেন, দেশের বিলুপ্তপ্রায় দেশি প্রজাতির মাছ চাষের জন‍্য চাষী পর্যায়ে উৎসাহ প্রধান করা হচ্ছে। তার জন্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ মোবাইলে বলেন,বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির মাছের পুনরুৎপাদনের জন্য গবেষণা কার্যক্রমকে গুরুত্ব দেওয়ায় জিন সংরক্ষণ, প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন এবং চাষাবাদ পদ্ধতির প্রক্রিয়া জানা সম্ভব হয়েছে। মাঠপর্যায়েও এ মাছের পোনা বিতরণ করা হয়েছে যা বিভিন্ন এলাকায় ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে। প্রতিবছর এ প্রতিষ্ঠানসহ ময়মনসিংহের বিভিন্ন হ্যাচারি থেকে প্রায় ২০০ কোটি দেশীয় মাছের পোনা দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হচ্ছে। দেশিয় মাছ সুরক্ষা ও গবেষণায় উল্লেখযোগ্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট একুশে পদক, কেআইবি কৃষি পদক, মার্কেন্টাইল ব্যাংক সম্মাননা পদকসহ ১৫টি জাতীয় পদক অর্জন করেছে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক।

চট্টগ্রাম জেলা মৎস্য অফিসার ফারহানা লাভলী বলেন, মৎস্য অধিদপ্তর বিভিন্ন ভাবে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে দেশের বিলুপ্ত প্রায় মাছ গুলো পূনরায় চাষী উৎপাদন করে ফিরিয়ে আনার জন‍্য।

Author: Md Arafat Hossain

Md Arafat Hossain is a publisher team chip and floating correspondent of D.A.B. News - দৈনিক আমার বাংলা।

Leave a Reply