চট্টগ্রামে আলাদা করে বার্ন হাসপাতাল নির্মাণ করবে চীন সরকার।

0
39
চট্টগ্রামে আলাদা করে বার্ন হাসপাতাল নির্মাণ করবে চীন সরকার।

মোঃ সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব‍্যুরো প্রধান- চীন সরকারের অনুদান সহায়তায় চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনের প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। জায়গা সংক্রান্ত জটিলতায় এ প্রকল্পটি বাতিল করলেও চট্টগ্রামে আলাদাভাবে বিশেষায়িত একটি বার্ন হাসপাতাল স্থাপন করতে চায় চীন সরকার। গত ২০ জুলাই অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে (ইআরডি) অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে চীন সরকারের পক্ষ থেকে এমন আগ্রহের কথা জানানো হয়। এতে বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে চট্টগ্রামে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন হাসপাতাল’ নির্মাণের প্রস্তাব দেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত। চীনা রাষ্ট্রদূতের এ প্রস্তাবে একমত হয়ে চট্টগ্রামে বিশেষায়িত এ হাসপাতাল স্থাপনে অভিপ্রায় ব্যক্ত করেছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেকও।
এর প্রেক্ষিতে চট্টগ্রামে বিশেষায়িত ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন হাসপাতাল’ স্থাপনের লক্ষ্যে জায়গা নির্ধারণের জন্য চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনে চিঠি দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (পরিকল্পনা ও গবেষণা) ডা. আফরিনা মাহমুদের স্বাক্ষরে ২৪ সেপ্টেম্বর এ চিঠি ইস্যু করা হয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক বরাবর প্রদত্ত এ চিঠিতে ‘বার্ন ইউনিট অব চিটাগাং মেডিকেল কলেজ হসপিটাল’-এর পরিবর্তে চীন সরকারের অনুদান সহায়তায় চট্টগ্রামে ‘বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন হাসপাতাল’ নির্মাণের জন্য উপযুক্ত স্থান নির্ধারণ করে তা চিঠির মাধ্যমে জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের এ সংক্রান্ত চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসনের আরডিসির (রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর) সাথে কথা বলার পরামর্শ দেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মো. ইলিয়াস হোসেন। তবে এখনো দাফতরিকভাবে এ সংক্রান্ত চিঠি পান নি বলে জানিয়েছেন আরডিসি নাজমুন নাহার। জেলা প্রশাসন চিঠি না পেলেও অনুলিপি হিসেবে চিঠির একটি কপি সিভিল সার্জন কার্যালয়ে পৌঁছেছে। চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন ডা. সেখ ফজলে রাব্বি এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ সরকারের প্রস্তাবের প্রেক্ষিতে সম্পূর্ণ আলাদা অবকাঠামোতে চট্টগ্রামে বিশেষায়িত একটি বার্ন ইউনিট গড়ে তোলার আগ্রহ প্রকাশ করে চীন সরকার। আগ্রহ প্রকাশের পর চীনা একটি প্রতিনিধি দল প্রথম দফায় ২০১৬ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর চমেক হাসপাতাল এলাকায় সম্ভাব্য স্থান পরিদর্শন করে। চীন সরকারের ৯ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলকে নিয়ে চট্টগ্রামে আসেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের বার্ন ইউনিটের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক ও সারাদেশে বার্ন চিকিৎসায় সমন্বয়কের দায়িত্ব পাওয়া ডা. সামন্ত লাল সেন।
ওই সময় চমেক হাসপাতালের পেছনের অংশে খালি জায়গা ও গোঁয়াছি বাগান এলাকাসহ বেশ কয়টি স্থান দেখানো হয় দলটিকে। এর মধ্য থেকে হাসপাতালের পেছনের অংশে খালি জায়গায় বিশেষায়িত এ ইউনিট গড়ে তুলতে চীনা প্রতিনিধি দলটি আগ্রহ প্রকাশ করে। হাসপাতাল প্রশাসনও তাতে সায় দেয়। এর প্রেক্ষিতে চীনা দলটি দেশে গিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে তা অবহিত করে। চীন সরকারও তাতে সম্মতি জানায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সবুজ সংকেত পাওয়ার পর চিহ্নিত এ জায়গা ঘিরে বিশেষায়িত বার্ন ইউনিটের অবকাঠামো নির্মাণের ডিজাইনও শেষ করে চীনা দলটি। পরে গত বছরের (২০১৯ সালের) ২৩ ফেব্রুয়ারি ২য় দফায় চমেক হাসপাতাল পরিদর্শনে আসলে নতুন তথ্য পায় তাঁরা। হাসপাতাল প্রশাসন থেকে তাঁদের জানানো হয়- চিহ্নিত ওই জায়গাটি এর আগে থেকেই একটি আধুনিক রেডিওলজি অ্যান্ড ইমেজিং সেন্টার স্থাপনের জন্য চিহ্নিত করা। আর সেটি নির্মাণ করা হবে জাপানি দাতা সংস্থা জাইকার অর্থায়নে। জাইকার প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এ প্রকল্পের ডিপিপি চূড়ান্ত হয়েছে আগেই। একনেকেও সেটি অনুমোদন করা হয়েছে। তাই চিহ্নিত এ জায়গা পরিবর্তন করা কঠিন। সেটা হলে পুনরায় নতুন করে ডিপিপি তৈরি ও সেটি আবারো একনেকে পাস করাতে হবে। যা সময় সাপেক্ষ। অন্যদিকে, চীনা প্রতিনিধি দলটির ভাষ্য, তাঁরাও চিহ্নিত জায়গাটি ঘিরে ইতোমধ্যে ডিজাইন শেষ করেছেন। নতুন কোন জায়গা চিহ্নিত করলেও তার জন্য পুনরায় সরকারের সম্মতি নিতে হবে। আর এ প্রক্রিয়ায় শুধু সম্মতি নিতেই পুনরায় ২ থেকে ৩ বছর সময় লেগে যেতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে খালি জায়গাটিতে দুই পক্ষকে আলাদাভাবে অবকাঠামো নির্মাণের প্রস্তাব দেয় চমেক হাসপাতাল প্রশাসন।
ওই সময় গণপূর্ত বিভাগ জানায়, ওই খালি অংশটিতে মোট ২ হাজার ৫০৮ বর্গমিটার জায়গা রয়েছে। যেখানে জাইকার প্রকল্পটির অবকাঠামো নির্মাণের জন্য ১ হাজার ৪৫২ বর্গমিটার জায়গা প্রয়োজন। ওই অংশটুকু বাদ দিলে আর ১ হাজার ৫৬ বর্গমিটার জায়গা অবশিষ্ট থাকে। কিন্তু বার্ন ইউনিটের অবকাঠামোর জন্য অন্তত দেড় হাজার বর্গমিটার জমির প্রয়োজন বলে জানায় চীনা প্রতিনিধি দল। ফলে ওই অংশে জায়গা সংকট দেখা দেয়। নতুন করে অন্য জায়গা চিহ্নিত করতে গেলেও সম্মতি পাওয়া সময়সাপেক্ষ।
সবমিলিয়ে স্থানীয়ভাবে এ সংকটের সুরাহা হয়নি। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে চীনা প্রতিনিধি দলসহ স্বাস্থ্য অধিদফতরে পুনরায় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। তবে সেখানেও এর কোন সুরাহা করা যায়নি। প্রকল্পটির জন্য যথাযথ স্থান নির্ধারণ করে না দেয়া এবং দীর্ঘ সময়েও যথাযথ পদক্ষেপ না নেয়ায় সর্বশেষ প্রকল্পটি বাতিল করার কথা জানায় চীনা রাষ্ট্রদূত।
এদিকে, ওই সময় চমেক হাসপাতালে ১০০ শয্যার বিশেষায়িত বার্ন ইউনিট স্থাপনের বিষয়ে ডা. সামন্ত লাল সেন বলেন, সবকিছুই তাঁরা (চীন সরকার) করবে। আগুনে পোড়া রোগীদের বিশেষায়িত ও উন্নত চিকিৎসায় আইসিইউসহ সব ধরনের সুবিধা সম্বলিত একশ শয্যার প্রতিষ্ঠানটি হবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। এটি হলে আগুনে পোড়া রোগীদের চট্টগ্রাম থেকে আর ঢাকায় ছুটতে হবে না। উন্নত চিকিৎসার অভাবে অল্পতেই আর মৃত্যু পথের যাত্রীও হতে হবে না এখানকার (চট্টগ্রামের) আগুনে পোড়া রোগীদের। ওই প্রকল্পটি বাতিল হলেও এখন নতুন প্রস্তাব করা বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ বার্ন হাসপাতালটিও আগুনে পোড়া রোগীদের চিকিৎসায় স্বয়ংসম্পূর্ণ একটি বিশেষায়িত হাসপাতাল হবে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Leave a Reply