চট্টগ্রামের বেতের আসবাবপত্রের কারিগরদের দুর্দিন চলছে।

চট্টগ্রামের বেতের আসবাবপত্রের কারিগরদের দুর্দিন চলছে।

মোঃ সিরাজুল মনির ব‍্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম – চট্টগ্রামের বেতের আসবাবপত্রের কারিগর ও ব্যবসায়ীরা ভালো নেই। দীর্ঘদিন ধরে নানামুখি সংকটে টিকে থাকা এই খাতটির কফিনে যেন শেষ পেরেক ঠুকে দিয়েছে করোনা। ভয়াল করোনায় বেতের ফার্নিচার ব্যবসায় একেবারে ধস নেমেছে। দোকান ভাড়া উঠাতেই হিমশিম খাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। কর্মচারী ও কারিগরদের বেতন ভাতা আটকা পড়ছে। এ অবস্থায় দেশীয় বেতের এই শিল্পের ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়েছে।

চট্টগ্রামের জাকির হোসেন রোড, এশিয়ান হাইওয়ের নাসিরাবাদ, স্টেশন রোড, আগ্রাবাদ, হালিশহরে বেতের ফার্নিচার তৈরির কারখানা ও দোকান রয়েছে। চট্টগ্রামে সর্বসাকুল্যে আটটি দোকান ও কারখানায় বেত-বাঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার তৈরি ও বিক্রি করা হয়। খাট, সোফা, ওয়্যারড্রব, ডাইনিং টেবিল, সাধারণ টেবিল, চেয়ার, মোড়া, দোলনা, আলনা, কোটস্ট্যান্ড থেকে শুরু করে কাঠ দিয়ে যত ফার্নিচার তৈরি করা হয়, তার সবই তৈরি করা যায় বেত ও বাঁশ দিয়ে। পার্বত্য চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চল থেকে আসা বেত এবং স্থানীয়ভাবে বাঁশ সংগ্রহ করে এসব ফার্নিচার তৈরি করা হয়। চাক্তাই এলাকায় দুইটি বড় ধরনের আড়ত থেকে চট্টগ্রামের সব কারখানাগুলো বেত সংগ্রহ করে। দামে সস্তা, দৃষ্টিনন্দন ও ওজনে হালকা হওয়ায় বেতের ফার্নিচারের দারুণ কদর। বিশেষ করে নগরজীবনে এই ফার্নিচারের বড় বাজার রয়েছে। দেশজ ঐতিহ্যবাহী নকশার আসবাবপত্র ছাড়াও বিদেশি বিভিন্ন ডিজাইনের ফার্নিচার তৈরি করা হয় বেত ও বাঁশ দিয়ে। বাঁশ-বেতের সাথে মাঝে মধ্যে কাঠের ব্যবহার করে দৃষ্টিনন্দন সব ফার্নিচার তৈরি হয় চট্টগ্রামের কারখানা ও দোকানগুলোতে।
দেশীয় ও আমদানিকৃত বিভিন্ন কাঠের পাশাপাশি স্টিল দিয়ে তৈরি ফার্নিচার দেশের বাজারের একটি বড় অংশ দখল করলেও বাঁশ বেতের ফার্নিচারের কদর খুব একটা কমেনি। অভিজাত থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ বাঁশ বেতের বিভিন্ন ফার্নিচার ব্যবহার করে আসছেন। দামে সস্তা হওয়ায় সাধারণ বহু মানুষও বাঁশ এবং বেতের ফার্নিচার কিনে ঘর সাজিয়েছেন। চট্টগ্রামের দোকানগুলোতে খোঁজ করে জানা গেছে, বাঁশ ও বেতের ফার্নিচারের মধ্যে চেয়ার-টেবিল সেট ১৪ হাজার থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সোফা সেটের দাম ১৩ হাজার থেকে ৭০ হাজার টাকা। বাচ্চাদের দোলনা দেড় হাজার টাকা থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা, মোড়া ৮শ’ থেকে আড়াই হাজার টাকা। খাট (ডাবল) ১১ হাজার টাকা থেকে ২০ হাজার টাকা, সেমি ডাবল বা সিঙ্গেল খাট ৭ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা, ডিভান সাড়ে ৬ হাজার থকে ২০ হাজার টাকা। ঝুড়ি কিনতে গুণতে হবে ১৩০০ থেকে ২৫০০ টাকা। ওয়্যারড্রব ৮ হাজার টাকা থেকে ১৫ হাজার টাকা, আলনা ২ হাজার থেকে ৩ হাজার টাকা, কোটস্ট্যান্ড ১২শ’ টাকা থেকে ১৫শ’ টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। বেতের মানের উপর ফার্নিচারের দাম নির্ভর করে। ভালো মানের বেত দিয়ে ফার্নিচার তৈরি করে যথাযথভাবে রঙ করে দেয়া হলে শুধু নান্দনিকতাই নয়, স্থায়ীত্বও আসে। বেতের ফার্নিচার কমপক্ষে দশ বছর ব্যবহার করা যায়। ২০/৩০ বছরে নষ্ট হবে না এমন বেতও রয়েছে। বাঁশ-বেতের আসবাবপত্র মেরামতে ঝামেলা নেই বললেই চলে। ফার্নিচার খুলে গেলে আবার মেরামত করে রং দিলেই নতুনের মতো হয়ে যায়। অল্প টাকাতেই যে কোন বাঁশ-বেতের দোকানে এগুলো মেরামত করে নেয়া যায়।
গতকাল সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে ঢিমেতালে কাজ করছেন কারিগররা। কোথাও কোন তাড়া নেই। নেই ব্যস্ততাও। দৈনিক আজাদীর সাথে আলাপকালে জাকির হোসেন রোডের ব্যবসায়ী মোহাম্মদ খোকন জানান, ব্যবসা নেই। তাই কাজও কম। আগে প্রতি মাসে এক দেড় লাখ টাকার ফার্নিচার বিক্রি হত । করোনার পর মাসে আট দশ হাজার টাকার ফার্নিচারও বিক্রি হচ্ছে না।
এশিয়ান হাইওয়ের নাসিরাবাদ এলাকায় দুইটি কেইন ফার্নিচারের দোকান রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ফার্নিচার বানালেও বিক্রিতে ধস নেমেছে বলে জানালেন তারা। একজন ব্যবসায়ী বলেন, কাঠের ফার্নিচারের পাশাপাশি জাহাজের পুরাতন ফার্নিচার, বিদেশ থেকে আনা কাঠ ও বোর্ডের ফার্নিচার বিপ্লবের মাঝে বাঁশ-বেতের ফার্নিচারের বাজারে সংকট চলছিল। সেই বাজার শেষ করে দিয়েছে করোনা।
মানুষ ফার্নিচার কিনছেন না বলে উল্লেখ করে ওই ব্যবসায়ী বলেন, ছোটখাটো বিয়ে-শাদী উপলক্ষে কেইন ফার্নিচার বিক্রি হতো, এখন তাও হচ্ছে না। একাধিক ব্যবসায়ী নিজেদের দুরবস্থার কথা তুলে ধরে বলেন, আমরা ভালো নেই। এই খাতটি খুবই খারাপ সময় পার করছে। কখন আবার সুদিন আসবে তাও অনিশ্চিত।
এ পেশার সাথে জড়িত এক মোসলেম জানায় একসময় বেতের ফার্নিচারে কদর ছিল তখন কারিগরদের ও কদর ছিল। এখন বেতের অনেক কারিগর বেকার হয়ে গেছে কাজ কমে যাওয়ায়।

Author: admin

Leave a Reply