“শিশুটির ওপর এমন বর্বরতা!

0
14

“শিশুটির ওপর এমন বর্বরতা!
প্রতিবেশীদের ফোনে গুলশান থেকে উদ্ধার করল পুলিশ”

Md.Sazirul Islam Lincoln.
Rajshahi Mohanogor.

কিশোরগঞ্জের স্বামীহারা হোসনা বেগম অভাবের তাড়নায় আদরের সন্তান রিক্তা আক্তারকে পাঁচ বছর বয়সেই তুলে দিয়েছিলেন পরিচিত একজনের কাছে। হাত ঘুরে সেই শিশুটির আশ্রয় হয় রাজধানীর গুলশানের নর্দা এলাকার একটি বাসায় গৃহকর্মী হিসেবে। শিশুটির যখন খেলার বয়স, বাবা-মায়ের স্নেহ পাওয়ার বয়স- তাকে তখন করতে হচ্ছিল বাসন ধোয়া থেকে ঘরদোর পরিস্কারের কাজ।

দীর্ঘ কয়েক বছর পর গতকাল মঙ্গলবার ফের মায়ের সঙ্গে দেখা হয়েছে রিক্তার। তবে মাকে কাছে পেয়েও তাকে ডাকতে পারেনি সে। রক্ত জমে ফুলে উঠেছে তার ঠোঁট দুটো। নাকের ওপরও রয়েছে আঘাতের দাগ। ক্ষীণ দেহের কাঁধ আর পিঠেও পেটানোর চিহ্ন। কথা বলার মতো অবস্থায় নেই সে।
অনেক আগে থেকেই কাজ করতে গিয়ে সামান্য ভুল হলেই গৃহকর্ত্রীর ভয়ানক নির্যাতন নেমে আসত রিক্তার ছোট্ট শরীরের ওপর। যাওয়ার জায়গা না থাকায় গত পাঁচ বছর ধরে সেই বর্বরতা সহ্য করতে হয়েছে তাকে। এভাবে ১০ বছরে পৌঁছেছে রিক্তা। গত সোমবার রাতেও তাকে ভয়ানক মারধর করা হচ্ছিল। তার আকাশ কাঁপানো আর্তনাদে স্থির থাকতে পারেননি প্রতিবেশীরা। জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশ ডাকেন তাদেরই একজন। শেষ পর্যন্ত রিক্তাকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) ভর্তি করে পুলিশ। শিশুটিকে নির্যাতনে অভিযুক্ত গৃহকর্তা মঈনুল হোসাইন ও তার স্ত্রী সুরমা আক্তারকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মঈনুল বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন, তার স্ত্রী গৃহিণী। এই দম্পতির পাঁচ ও তিন বছর বয়সী দুটি ছেলে রয়েছে। নির্যাতনের শিকার শিশুটির মা হোসনা বেগম গতকাল মঙ্গলবার কিশোরগঞ্জের গ্রামের বাড়ি থেকে ঢাকায় এসে ওই দম্পতির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

এই মা বহু বছর পর পুলিশের সহায়তায় সন্তানকে দেখতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওসিসিতে ছুটে যান। কিন্তু বুকের ধনকে চিনতে কষ্টই হয় তার। কারণ শরীরজুড়ে বর্বরতার ছাপ ঢেকে ফেলেছে রিক্তার চেহারাকে। কথা বলারও শক্তি নেই তার।

চোখের পানি মুছতে মুছতে হোসনা বেগম বলছিলেন, রিক্তা ছোট থাকতেই তার স্বামী মারা গেছেন। এরপর দুই মেয়ে নিয়ে তিনি বিপাকে পড়ে যান। মানুষের বাসায় কাজ করেও সন্তানদের মুখে খাবার তুলে দিতে পারছিলেন না। প্রতিবেশীদের পরামর্শে ছোট মেয়েকে এক স্বজনের কাছে তুলে দিয়েছিলেন। সেখান থেকে গুলশানে মঈনুল সাহেবের বাসায় তাকে লালন-পালন করতে দেওয়া হয়েছিল। তবে তিনি বছরখানেক আগে একবার ওই বাসায় মেয়েকে দেখতে এসেছিলেন। হোসনা বেগম বলছিলেন, মেয়েকে এভাবে মেরেছে যে, প্রথমে তিনি চিনতে পারেননি।

গ্রেপ্তার গৃহকর্ত্রী সুরমা আক্তার পুলিশের কাছে দাবি করেন, এর আগে কখনও রিক্তাকে মারেননি তিনি। দুষ্টুমি করায় সোমবার রাতে হঠাৎ প্রথমবারের মতো মেরেছেন। তবে এভাবে তাকে মারা ঠিক হয়নি, তা এখন বুঝতে পারছেন।

গৃহকর্তা মঈনুল দাবি করেন, তিনি রিক্তাকে তার মেয়ের মতোই লালনপালন করছিলেন। তার অনুপস্থিতিতে রাগের মাথায় স্ত্রী তাকে মেরেছে। যেটা ঠিক হয়নি।

অবশ্য ৯৯৯-এ পুলিশকে খবর দেওয়া এক প্রতিবেশী সমকালকে বলেছেন, মাঝেমধ্যেই মেয়েটির ওপর নির্যাতন চলত। তিন তলার ফ্ল্যাট থেকে নির্যাতনের আওয়াজ আসত। সোমবার রাতেও শিশুটিকে মারধর করা হয়। শিশুটির চিৎকারে তারা এগিয়ে যান। শিশুটিকে রক্তাক্ত অবস্থায় দেখে তার মমতা হয়। তাই ৯৯৯-এ পুলিশকে খবর দেন। গৃহকর্ত্রী শিশুটিকে মারধর করলেও গৃহকর্তা ওই সময় বাসাতেই ছিলেন।

গুলশান থানার ওসি আবুল হাসান বলেন, শিশুটিকে উদ্ধার করে পুলিশ হেফাজতে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। মামলার পর অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হচ্ছে।

চিকিৎসককে উদ্ৃব্দত করে ওসি বলেন, আঘাতের কারণে মেয়েটির চোখে সমস্যা হয়েছে। এ ছাড়া অভ্যন্তরীণ আর কোনো সমস্যা রয়েছে কিনা, চিকিৎসকরা তা পরীক্ষা করছেন।

Leave a Reply