করোনার প্রভাবে চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানিতেও ধস।

0
16
করোনার প্রভাবে চট্টগ্রাম থেকে জনশক্তি রপ্তানিতেও ধস।
মোঃ সিরাজুল মনির ব‍্যুরো প্রধান চট্টগ্রাম।

চট্টগ্রাম থেকে সাত মাসে মাত্র ৬১ জন মানুষ নতুন ভিসায় চাকরি করতে বিদেশে গেছেন। অথচ স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই সময়ে অন্তত ২৫ হাজার মানুষ বিদেশ যাওয়ার কথা। জনশক্তি রপ্তানির নজিরবিহীন এই ধসে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের অন্যতম প্রধান খাত শ্রমবাজারে বড় ধরনের ধসের আশংকা করা হচ্ছে। অপরদিকে বিদেশ থেকে দেশে ছুটিতে আসা এক লাখেরও বেশি মানুষ আটকা পড়েছেন। এছাড়া চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরে এসেছেন কয়েক হাজার মানুষ। সবকিছু মিলে কঠিন এক পরিস্থিতিতে পড়েছে দেশের জনশক্তি রপ্তানি খাত। ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকটের আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সূত্র বলছে, দেশের এক কোটিরও বেশি মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাস করেন। চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করে প্রবাসী এই বিপুল জনগোষ্ঠী বছরে গড়ে দেড় হাজার কোটি ডলারের মতো দেশে পাঠান। রেমিটেন্স হিসেবে পাঠানো এই অর্থের একটি অংশ হুন্ডির মাধ্যমে আসলেও বেশির ভাগই আসে ব্যাংকিং চ্যানেলে। রেমিটেন্স অর্জনের দিক দিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বের অষ্টম বৃহৎ দেশ। বিদেশ থেকে আসা এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতির শক্ত ভিত তৈরি করে। অতীতে বিভিন্ন সময় বিশ্বমন্দাসহ নানাভাবে বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করলেও শুধুমাত্র রেমিটেন্স প্রবাহ ঠিক থাকায় বাংলাদেশের অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়েনি। কিন্তু করোনাকালে সেই রেমিটেন্স প্রবাহে বড় ধরনের হোঁচট খাওয়ার শংকা প্রকাশ করে বলা হয়েছে, বিদেশে শ্রমবাজার ক্রমে সংকুচিত হচ্ছে। এই বিপর্যয় কাটিয়ে উঠা না গেলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে। বাংলাদেশ থেকে বিশ্বের ১৫৯টি দেশে জনশক্তি রপ্তানি হয়। নানাভাবে নানা পন্থায় এদেশের মানুষ চাকরি ও ব্যবসা করতে বিভিন্ন দেশে পাড়ি দিয়েছেন। কিন্তু বাংলাদেশীদের সবচেয়ে বড় বাজার রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যে। সৌদি আরবে ২০ লাখেরও বেশি বাংলাদেশি বসবাস করেন। এছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, আবুধাবী ও শারজাহসহ বিভিন্ন প্রদেশে বসবাস করেন ১০ লাখের মতো বাংলাদেশি। এর বাইরে কুয়েত, কাতার ও ওমানে আরো অন্তত ১৫ লাখ বাংলাদেশী চাকরি ও ব্যবসা বাণিজ্য করেন। প্রবাসী বাংলাদেশীরা নিজেদের আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধুবান্ধবদেরও একে একে বিদেশ নিয়ে যান। ভিসা বিক্রি করে তারা নানা শ্রেণি-পেশার লোকজনকে বিদেশ নেন।
চট্টগ্রাম থেকে প্রতি মাসে গড়ে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ নতুন ভিসা নিয়ে বিভিন্ন দেশে কাজ করতে যান বলে জনশক্তি রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর হিসেব থেকে জানা গেছে। ২০১৯ সালে চট্টগ্রাম থেকে নতুন ভিসায় কাজ করতে গেছেন ৩৩ হাজার ৪৬৪ জন মানুষ। কিন্তু ২০২০ সালে করোনার কারণে জনশক্তি রপ্তানিতে নজিরবিহীন ধস নামে। ২০২০ সালের এপ্রিল থেকে সদ্য সমাপ্ত অক্টোবর পর্যন্ত সর্বসাকুল্যে ৬১ জন মানুষ নতুন ভিসায় বিদেশ গেছেন।
চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসে চট্টগ্রাম থেকে কর্মসূত্রে নতুন ভিসা নিয়ে বিদেশ যান মাত্র ছয় জন। মে ও জুন মাসে কাজ করার জন্য কেউ বিদেশ যাননি। জুলাই মাসে একজন, আগস্ট মাসে তিনজন, সেপ্টেম্বরে একজন এবং অক্টোবর মাসে ৫০ জন বিদেশ গেছেন। করোনার কারণে বিশ্বব্যাপী ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যাওয়াসহ বিভিন্ন সংকটে জনশক্তি রপ্তানিতে এই ধস নেমেছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
অথচ স্বাভাবিক সময়ে প্রতি মাসে চট্টগ্রাম থেকে তিন হাজারেরও বেশি মানুষ কর্মসূত্রে নতুন ভিসা নিয়ে কাজে যান বলে উল্লেখ করে জনশক্তি অফিসের ওই এক কর্মকর্তা বলেন, জানুয়ারি মাসে চট্টগ্রাম থেকে নতুন ভিসায় তিন হাজার ৫৬৩ জন, ফেব্রুয়ারিতে তিন হাজার ১৫০ এবং মার্চ মাসে তিন হাজার ৯৩ জন চাকরির জন্য মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গিয়েছেন। ২৬ মার্চ থেকে দেশে লকডাউন শুরু এবং বিশ্বব্যাপী করোনার ভয়াল থাবায় জনশক্তি রপ্তানিতে ধস নামে। শুধু চট্টগ্রামই নয়, সারা দেশের পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক বলে উল্লেখ করে নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই কর্মকর্তা বলেন, এই বছর সাড়ে সাত লাখ মানুষের বিদেশে কর্মসংস্থানের লক্ষ্য ধরা হলেও কোভিড-১৯ এর কারণে মাত্র দুই লাখের কিছু বেশি মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের উপ-পরিচালক জহিরুল আলম মজুমদার সাথে আলাপকালে বলেন, পরিস্থিতি খুবই ভয়াবহ। করোনার জন্য বিদেশ যাওয়া অনেক কঠিন হয়ে উঠেছে। ফ্লাইট বন্ধ থাকায় মানুষ বিদেশ যেতে পারেননি। করোনা বিদেশেও নানা সংকট তৈরি করেছে। সবকিছু মিলে চলতি বছরের শুরুতে জনশক্তি রপ্তানি নিয়ে আমরা বেশ আশাবাদী হয়ে উঠেছিলাম। করোনা মহামারি আমাদের সেই আশা ভেঙে দিয়েছে। জনশক্তি রপ্তানি একেবারে তলানিতে এসে ঠেকার কথা স্বীকার করে পরিস্থিতি কবে নাগাদ স্বাভাবিক হবে তা অনিশ্চিত বলেও জানান তিনি।
জনশক্তি রপ্তানির নজিরবিহীন এই ধস রেমিটেন্স প্রবাহে বড় ধরনের সংকট তৈরি করবে বলে আশংকা প্রকাশ করেছেন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ এবং বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. মইনুল ইসলাম। আলাপকালে তিনি বলেন, এখন রেমিটেন্স কিছুটা বেড়েছে। বিশেষ করে হুন্ডি বন্ধ হওয়া এবং দুই শতাংশ প্রনোদনার কারণে রেমিটেন্সে প্রভাব পড়েছে। আবার যারা একবারেই চলে এসেছেন তারাও বিদেশ থেকে তাদের সর্বস্ব নিয়ে এসেছেন। এটিও রেমিটেন্সে যুক্ত হয়েছে। কিন্তু ৭ মাসে ৬১ জনের কাজে যাওয়ার পরিস্থিতি পুরো সেক্টরকেই বড় ধরনের ধাক্কা দেবে। এই ধাক্কার জন্য তিনি সরকারকে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকারও পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, পরিস্থিতি খুবই খারাপ। করোনার সেকেন্ড ওয়েভ পরিস্থিতিকে আরো নাজুক করে দিতে পারে।

Leave a Reply