চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।

0
17
D.A.B. News - দৈনিক আমার বাংলা
D.A.B. News - দৈনিক আমার বাংলা
চট্টগ্রামে নারী ও শিশু নির্যাতন ক্রমান্বয়ে বেড়ে চলেছে।
মোঃ সিরাজুল মনির চট্টগ্রাম ব‍্যুরো প্রধান।

চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা। কোথাও শিশু, আবার কোথাও নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন। নিম্ন আয়ের পরিবারের শিশু থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষিত তরুণী কিংবা নারীরাও ধর্ষকদের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না।

গৃহকর্তার হাতে গৃহকর্মী, প্রতিবেশীর হাতে শিশু, পূর্ব পরিচিতের হাতে তরুণী, বন্ধুর হাতে বান্ধবী, এমনকি শিক্ষকের হাতে ছাত্রী কেউ বাদ পড়ছে না। অথচ গত মাসেই ধর্ষণের শাস্তি বাড়িয়ে যাবজ্জীবন থেকে মৃত্যুদণ্ড করে প্রজ্ঞাপন জারি করে সরকার। এরপরও বন্ধ করা যাচ্ছে না ধর্ষণ।

আইনজীবীরা বলছেন, শুধু শাস্তিবাড়ালে ধর্ষণের ঘটনা বা ধর্ষণ প্রবণতা কমানো বা বন্ধ করা সম্ভব নয়। সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে বন্ধন সৃষ্টি করতে হবে। মানুষের মন থেকে কিভাবে অস্থিরতা কমানো যায় বা কিভাবে মানুষকে ধর্ষণ কাজ থেকে বিরত রাখা যায় সেটা রাষ্ট্রীয়ভাবে ভাবতে হবে এবং সে অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

সংশ্লিষ্টা বলছেন, বর্তমানে এক শ্রেণির মানুষের কাছে প্রায় ৯০ শতাংশ সম্পদ পুঞ্জিভুত হয়ে আছে। এখান থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সম্পদের সুসম বন্টন করতে হবে।

চট্টগ্রামের বোয়ালখালী উপজেলার চরখিজিরপুর গ্রামের একটি বাড়ীতে গত ৩১ অক্টোবর গৃহকর্তার হাতে ধর্ষণের শিকার হয় গৃহকর্মী মনা (ছদ্মনাম)। মিলাদুন্নবীর তবারক নিতে ডেকে নিয়ে রান্না ঘরের দরজা বন্ধ করেই মনাকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় অভিযোগ দায়ের করলে গৃহকর্তা ফজল করিমকে (৬৫) পরের দিন ১ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে চরখিজিরপুর গ্রাম থেকে গ্রেফতার করে বোয়ালখালী থানা পুলিশ।

পাশের আরেক গ্রাম শাকপুরা বড়ুয়ারটেক গ্রাম। এ গ্রামের ১২ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করেন পয়ত্রিশ বছর বয়সী যুবক শিমুল দে (৩৫)। বোনের সাথে খেলার সময়ই প্রলোভন দেখিয়ে একটি পোশাক কারখানার পেছনে নিয়ে গিয়েই ওই শিশুকে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনা জানতে পেরে শিশুর মা বোয়ালখালী থানায় একটি মামলা করলে গত ১ নভেম্বর অভিযান চালিয়ে বোয়ালখালী থানা পুলিশ শিমুলে দে’কে নিজ বাড়ী থেকে গ্রেফতার করেন।

শুধু বোয়ালখালীতে ধর্ষণ ঘটনা ঘটছে না। জেলা উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় কয়েকদিন পরপর এমন ধর্ষণ ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ ১ নভেম্বর রাত আড়াইটার দিকে নগরীর বন্দর থানার আউটার লিংক রোড এলাকায় একটি সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় পুলিশ অভিযান চালিয়ে কথিত প্রেমিক শফিকুল ইসলাম ও তার সহযোগী বাদশা ও শাহিনকে গ্রেফতার করেছে। তারও আগে গত ১৯ অক্টোবর নগরীর পতেঙ্গা থানার মুসলিমাবাদের জমিয়াতুল মদিনা এবতেদায়ী মাদ্রাসায় যৌন হয়রানির শিকার হয় মাদ্রাসার পাশের ৫ বছর বয়সী এক শিশু। ফুসলিয়ে মাদ্রাসার ভেতরে নিয়ে গিয়েই ওই শিশুকে যৌন হয়রানি করা হয়। এ ঘটনায় শিশুর মা থানায় হাজির হয়ে মামলা দায়ের করলে মূল অভিযুক্ত মাকসুদুর রহমান ও তার সহযোগী মামুনুর রশিদকে মাদ্রাসা থেকে গ্রেফতার করে পতেঙ্গা থানা পুলিশ।

এছাড়া বাঁশখালী উপজেলার চাম্বল এলাকায় লোমহর্ষক এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। গত ১ নভেম্বর রাতে কুমিল্লার দেবীদ্বার থেকে পালিয়ে বেড়ানো মোজাম্মেল হক নামের এক মাদ্রাসা শিক্ষককে গ্রেফতারের পর বিষয়টি জানাজানি হয়। গ্রেফতার মোজাম্মেল হক বাঁশখালীর চাম্বল এলাকার একটি মক্তবে (ফোরকানিয়া মাদ্রাসা) পড়ানোর ফাঁকে ১১ বছরের এক মেয়ে শিশুকে ধর্ষণ করেন। মোজাম্মেল হককে গ্রেফতারের পর র‌্যাব জানিয়েছেন, ১১ বছরের ওই শিশুকে মোজাম্নেল হক চারবার ধর্ষণ করেন।

জেলা পুলিশ, নগর পুলিশ ও র‌্যাবের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, নারী-শিশু সে যেই হোক ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া মাত্রই তারা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিদের গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠাচ্ছেন। কোনোভাবেই কাউকে ছাড় দেয়া হচ্ছে না।

জামেয়াতুল ইমান মাদ্রাসার পরিচালক মাওলানা মীর ইদ্রিস বলেন, আল্লাহর ভয় যার কাছে থাকবে সে কখনো ধর্ষণ কাজে যুক্ত হবেন না। সবার মাঝে আল্লাহর ভয় যাতে আসে সেজন্য শিক্ষা ব্যবস্থায় ইসলামী শিক্ষা যুক্ত করতে হবে। নৈতিকতার বিষয়টি শিক্ষা ব্যবস্থায় আনতে হবে। বিচারের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি রাখা যাবে না। তাহলে ধর্ষণ ঘটনা সমাজে কমে আসবে এবং একসময় লোমহর্ষক এসব ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে।

র‌্যাব-৭ এর এএসপি মাহমুদুল হাসান মামুন বলেন, ঘটনার পরপরই অপরাধীদের আমরা গ্রেফতার করছি এবং অপরাধীদের আইনের কাছে সোপর্দ করছি। এরপরও কেন সমাজে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনা ঘটছে সেটা বলতে পারছি না। সমাজবিজ্ঞানীরাই ভালো বলতে পারবেন।

এদিকে, শাস্তির পরিমাণ বাড়ানোর পরও সমাজে কেন ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটছে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপচার্য ও সমাজবিজ্ঞানী ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, কোনো একটা সমাজে যখন অস্তিরতা দেখা দেয় তখন এ ধরণের ঘটনা ঘটে। মানুষের সাথে মানুষের বন্ধন ভেঙে পড়লেও এ ধরণের ঘটনা ঘটে। এখান থেকে মুক্তি পেতে প্রথমেই ভুক্তভোগী পরিবার ও আত্মীয়স্বজনকে শক্ত হয়ে নির্যাতিতের পাশে দাঁড়াতে হবে। প্রতিবাদ করতে হবে। ভয় পেলে চলবে না।

তিনি বলেন, সরকারের একার পক্ষে ধর্ষণ, খুনের মতো ঘটনা বন্ধ করা সম্ভব নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সাংবাদিক ও শিক্ষক থেকে শুরু করে সমাজের সকল পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। অলি-গলিতে আওয়াজ তুলতে হবে। এলাকাভিত্তিক কমিটি করে রুখে দাঁড়াতে হবে।

আরেক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উপর আস্থা রাখতে হবে। অন্যথায় সমাজের নৈরাজ্য ঠেকানো সম্ভব নয়।

Leave a Reply